নিউইয়র্ককে শুধু আকাশচুম্বী ভবন, ওয়াল স্ট্রিট কিংবা পর্যটনের শহর হিসেবে দেখলে এর অর্থনীতির একটি বড় বাস্তবতা আড়ালেই থেকে যায়। শহরটির হাসপাতাল, রেস্তোরাঁ, হোটেল, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, বাড়িভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবা থেকে শুরু করে দৈনন্দিন নাগরিক সেবার বড় একটি অংশ পরিচালিত হচ্ছে অভিবাসী কর্মীদের শ্রমে। ২০২৬ সালের নিউইয়র্ক সিটি কর্তৃপক্ষের The Newest New Yorkers প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, ২০২৩ সালে […]
ফাইল ছবি
নিউইয়র্ককে শুধু আকাশচুম্বী ভবন, ওয়াল স্ট্রিট কিংবা পর্যটনের শহর হিসেবে দেখলে এর অর্থনীতির একটি বড় বাস্তবতা আড়ালেই থেকে যায়। শহরটির হাসপাতাল, রেস্তোরাঁ, হোটেল, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, বাড়িভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবা থেকে শুরু করে দৈনন্দিন নাগরিক সেবার বড় একটি অংশ পরিচালিত হচ্ছে অভিবাসী কর্মীদের শ্রমে।
২০২৬ সালের নিউইয়র্ক সিটি কর্তৃপক্ষের The Newest New Yorkers প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, ২০২৩ সালে শহরে বিদেশে জন্মগ্রহণকারী মানুষের সংখ্যা ছিল প্রায় ৩১ লাখ—মোট জনসংখ্যার ৩৭ দশমিক ৫ শতাংশ। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, শহরের মোট কর্মশক্তির ৪৩ শতাংশই বিদেশে জন্মগ্রহণকারী।
অভিবাসীদের অর্থনৈতিক ভূমিকার সবচেয়ে স্পষ্ট চিত্র পাওয়া যায় কর্মক্ষেত্রে। নিউইয়র্কের সবচেয়ে বড় শিল্পখাত স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক সহায়তা খাতে কর্মরত ১১ লাখ ৭০ হাজার মানুষের মধ্যে প্রায় ৫ লাখ ১৯ হাজারই বিদেশে জন্মগ্রহণকারী। অর্থাৎ এ খাতের কর্মীদের প্রায় ৪৪ শতাংশ অভিবাসী।
শুধু তাই নয়, বাড়িভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবা খাতে বিদেশে জন্মগ্রহণকারী কর্মীর সংখ্যা প্রায় ১ লাখ ৮ হাজার। এই উপখাতে কর্মরতদের প্রায় তিন-চতুর্থাংশই অভিবাসী। হাসপাতাল, স্কুল ও পরিবারভিত্তিক সামাজিক সেবাতেও তাদের বড় উপস্থিতি রয়েছে।
খাদ্যসেবা ও আবাসন খাতেও একই চিত্র। এসব খাতে কর্মরতদের প্রায় পাঁচজনের মধ্যে তিনজন বিদেশে জন্মগ্রহণকারী। ফলে নিউইয়র্কের রেস্তোরাঁ, হোটেল ও পর্যটননির্ভর অর্থনীতির সঙ্গেও অভিবাসী শ্রম সরাসরি যুক্ত।
নিউইয়র্কের অর্থনীতিতে অভিবাসীদের ভূমিকা শুধু চাকরির বাজারে সীমাবদ্ধ নয়। নিজেদের ব্যবসা পরিচালনা ও স্বনিয়োজিত কর্মী হিসেবেও তাদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য।
নগর কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, বিদেশে জন্মগ্রহণকারী পুরুষ কর্মীদের প্রায় ১৪ শতাংশ স্বনিয়োজিত। বাংলাদেশি, পাকিস্তানি, রুশ ও কোরীয় অভিবাসী পুরুষদের মধ্যে স্বনিয়োজিত হওয়ার হার তুলনামূলকভাবে বেশি—প্রায় ২০ থেকে ২৫ শতাংশ।
অর্থাৎ অভিবাসী জনগোষ্ঠী একদিকে নিউইয়র্কের শ্রমবাজারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ, অন্যদিকে ছোট ব্যবসা ও উদ্যোক্তা অর্থনীতিরও একটি বড় ভিত্তি।
নিউইয়র্কের পাঁচ বরোতেই অভিবাসীদের উপস্থিতি থাকলেও কুইন্স ও ব্রুকলিনে তাদের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। ২০২৩ সালের হিসাবে কুইন্সে প্রায় ১০ লাখ ৯০ হাজার এবং ব্রুকলিনে প্রায় ৯ লাখ ২০ হাজার বিদেশে জন্মগ্রহণকারী মানুষ বসবাস করতেন। দুই বরো মিলিয়ে শহরের অভিবাসী জনগোষ্ঠীর প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ বাস করে।
ফলে এসব এলাকায় শুধু জনসংখ্যার বৈচিত্র্যই নয়, ব্যবসা, খাদ্যসংস্কৃতি, স্থানীয় বাজার ও কমিউনিটি জীবনেও অভিবাসনের প্রভাব সবচেয়ে দৃশ্যমান।
অভিবাসী জনগোষ্ঠীর উৎসের দিক থেকেও নিউইয়র্কের চিত্র বদলে গেছে। চীন ও ডমিনিকান রিপাবলিক বর্তমানে শহরের সবচেয়ে বড় বিদেশে জন্মগ্রহণকারী জনগোষ্ঠীর উৎস। এরপর রয়েছে জ্যামাইকা ও মেক্সিকো।
দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থানও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ২০২৩ সালের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ নিউইয়র্কের শীর্ষ ১০ বিদেশি জন্মভূমির তালিকায় রয়েছে এবং গত এক দশকে দেশটির অবস্থান আরও ওপরে উঠেছে।
অভিবাসনের প্রভাব শুধু অর্থনীতির হিসাবেই সীমাবদ্ধ নেই। নিউইয়র্কের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ও এর সঙ্গে বদলে যাচ্ছে।
নগর কর্তৃপক্ষের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, শহরের প্রায় ৪৮ শতাংশ বাসিন্দা বাড়িতে ইংরেজি ছাড়া অন্য কোনো ভাষা ব্যবহার করেন। একই সঙ্গে শহরের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ বাসিন্দা হয় নিজেরাই বিদেশে জন্মগ্রহণ করেছেন, নয়তো অন্তত একজন অভিবাসী বাবা-মায়ের সন্তান।
অর্থাৎ নিউইয়র্কে অভিবাসন এখন আর শুধু নতুন করে আসা মানুষের গল্প নয়; এটি একাধিক প্রজন্ম ধরে শহরের জনসংখ্যা, সংস্কৃতি ও সামাজিক কাঠামোকে প্রভাবিত করছে।
২০২৩ সালে শহরের বিদেশে জন্মগ্রহণকারী জনসংখ্যা প্রায় ৩১ লাখে স্থির থাকলেও এর ভেতরের বৈচিত্র্য বাড়ছে। গত এক দশকে মোট সংখ্যা খুব বেশি না বদলালেও নতুন দেশ ও অঞ্চলের মানুষের উপস্থিতি বেড়েছে।
নগর কর্তৃপক্ষের এই পরিসংখ্যান তাই শুধু অভিবাসীর সংখ্যা গণনার বিষয় নয়। এটি দেখাচ্ছে, নিউইয়র্কের শ্রমবাজার, স্বাস্থ্যসেবা, ব্যবসা, খাদ্য ও পর্যটন খাত এবং সামাজিক কাঠামো—সবকিছুর সঙ্গেই অভিবাসী জনগোষ্ঠীর গভীর সম্পর্ক তৈরি হয়েছে।
৩১ লাখ মানুষের এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে বাদ দিয়ে নিউইয়র্কের বর্তমান অর্থনীতি যেমন ব্যাখ্যা করা কঠিন, তেমনি শহরটির ভবিষ্যৎ নগরজীবনের চিত্রও অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।