হরমুজ প্রণালিতে আটকে আছে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) জাহাজ। একের পর এক কার্গো বাতিল হচ্ছে। আর এর প্রভাব এখন পড়তে শুরু করেছে কাতারের দীর্ঘমেয়াদি ক্রেতাদের ওপর—যার মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশও। হরমুজ প্রণালি দিয়ে এলএনজি পরিবহন এখনো স্বাভাবিক না হওয়ায় কাতারের রাষ্ট্রীয় জ্বালানি প্রতিষ্ঠান কাতারএনার্জি আবারও ‘ফোর্স মেজর’ বা চুক্তিগত দায়মুক্তির মেয়াদ বাড়িয়েছে। বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের ক্রেতাদের […]
ছবি: সংগৃহীত
হরমুজ প্রণালিতে আটকে আছে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) জাহাজ। একের পর এক কার্গো বাতিল হচ্ছে। আর এর প্রভাব এখন পড়তে শুরু করেছে কাতারের দীর্ঘমেয়াদি ক্রেতাদের ওপর—যার মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশও।
হরমুজ প্রণালি দিয়ে এলএনজি পরিবহন এখনো স্বাভাবিক না হওয়ায় কাতারের রাষ্ট্রীয় জ্বালানি প্রতিষ্ঠান কাতারএনার্জি আবারও ‘ফোর্স মেজর’ বা চুক্তিগত দায়মুক্তির মেয়াদ বাড়িয়েছে। বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের ক্রেতাদের জানানো হয়েছে, অক্টোবর পর্যন্ত এলএনজি কার্গো বাতিলের ধারা অব্যাহত থাকবে।
বিষয়টি সম্পর্কে অবগত কয়েকজন ব্যবসায়ীর বরাত দিয়ে এ তথ্য জানিয়েছে ব্লুমবার্গ।
হরমুজ প্রণালির সংকটের মধ্যেও সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে তেল পরিবহন কিছুটা ঘুরে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু এলএনজির ক্ষেত্রে সেই সুযোগ নেই।
কারণ অপরিশোধিত তেল বিকল্প রুটে পাঠানোর কিছু সুযোগ থাকলেও এলএনজি পরিবহনে তা কার্যত সম্ভব নয়। হরমুজ প্রণালি পার হওয়ার পর অন্য জাহাজে তুলে দেওয়ার মতো শিপ-টু-শিপ বা এসটিএস (STS) ট্রান্সফারের মাধ্যমেও এলএনজিকে সহজে বিকল্প পথে পাঠানো যাচ্ছে না।
ফলে কাতারসহ পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের গ্যাস রপ্তানিকারকদের জন্য পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
শুধু বাংলাদেশ ও পাকিস্তান নয়, ইউরোপের ক্রেতারাও এর প্রভাব থেকে রেহাই পাচ্ছেন না।
দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় ইউরোপে যাওয়ার কথা ছিল এমন কিছু এলএনজি সরবরাহও সেপ্টেম্বরের পর বাতিল করা হয়েছে। ইতালির জ্বালানি প্রতিষ্ঠান এডিসন জানিয়েছে, কাতারএনার্জির ‘ফোর্স মেজর’ এবং কার্গো বাতিলের সময়সীমা নভেম্বরের শুরুর দিক পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।
এর আগে জুলাইয়ের শেষদিকে এডিসন জানিয়েছিল, কাতারএনার্জি তাদের জন্য নির্ধারিত আরও তিনটি এলএনজি কার্গো বাতিল করেছে এবং তখন ‘ফোর্স মেজর’-এর মেয়াদ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছিল।
২৮ জুলাই পর্যন্ত এডিসনের জন্য নির্ধারিত মোট ২৪টি এলএনজি কার্গো ‘ফোর্স মেজর’-এর আওতায় পড়েছিল। এসব কার্গোর সম্মিলিত পরিমাণ ছিল প্রায় ৩০০ কোটি ঘনমিটার প্রাকৃতিক গ্যাস।
হরমুজ সংকটের প্রভাব কাতারের জন্য কতটা ভয়াবহ হয়ে উঠেছে, তার চিত্র পাওয়া যাচ্ছে রপ্তানি পরিসংখ্যানে।
রয়টার্সের সাম্প্রতিক হিসাব অনুযায়ী, এলএনজি রপ্তানি সর্বোচ্চ ৯৬ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। ছয় মাস ধরে চলা এই সংকটে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম এলএনজি রপ্তানিকারক দেশটির সম্ভাব্য বিক্রয়মূল্য ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২৪ বিলিয়ন ডলার।
ডেটা ইন্টেলিজেন্স প্রতিষ্ঠান আইসিসের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের একই সময়ে কাতার থেকে ৫০৯টি এলএনজি কার্গো পাঠানো হয়েছিল। অথচ চলতি সময়ে এখন পর্যন্ত দেশটি রপ্তানি করতে পেরেছে মাত্র ১৮টি কার্গো।
অর্থাৎ একদিকে কাতারের রাজস্বে বড় ধাক্কা এসেছে, অন্যদিকে দেশটির ওপর নির্ভরশীল ক্রেতাদের জ্বালানি সরবরাহ নিয়েও তৈরি হয়েছে নতুন অনিশ্চয়তা।
বাংলাদেশের জ্বালানি ব্যবস্থায় এলএনজি গুরুত্বপূর্ণ একটি উপাদান। বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্পকারখানায় গ্যাসের চাহিদা পূরণে আমদানিকৃত এলএনজির ওপর নির্ভরতা রয়েছে।
এ অবস্থায় কাতার থেকে নির্ধারিত এলএনজি কার্গো সরবরাহ আরও কয়েক সপ্তাহ বন্ধ বা বাতিল থাকলে দেশের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় বাড়তি চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
হরমুজ প্রণালির সংকট তাই শুধু মধ্যপ্রাচ্যের একটি নৌপথের সমস্যা হয়ে থাকছে না। এর প্রভাব ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে—আর সেই ঢেউয়ের প্রভাব অনুভব করতে পারে বাংলাদেশও।