সম্পূর্ণ নিউজ বাংলা-ভয়েজ

আন্তর্জাতিক
১:৫৪ পিএম, ২ অক্টোবর ২০২৬

নতুন রণতরি ও ১০ হাজার সেনা পাঠাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, বাড়ছে ইরান যুদ্ধের উত্তেজনা

ইরান যুদ্ধের অষ্টম মাসে মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উপস্থিতি আরও বাড়াচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। ইরানের কাছাকাছি জলসীমায় তৃতীয় একটি বিমানবাহী রণতরী বহর পাঠানোর পাশাপাশি আরও ৯ থেকে ১০ হাজার মার্কিন সেনা ও নৌসদস্য ওই অঞ্চলের পথে রয়েছেন। এতে চলমান সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। আল জাজিরার প্রতিবেদনে এক মার্কিন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে বলা […]

নতুন রণতরি ও ১০ হাজার সেনা পাঠাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, বাড়ছে ইরান যুদ্ধের উত্তেজনা

ছবি: সংগৃহীত

নিজস্ব প্রতিবেদক
৫ মিনিটে পড়ুন |

ইরান যুদ্ধের অষ্টম মাসে মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উপস্থিতি আরও বাড়াচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। ইরানের কাছাকাছি জলসীমায় তৃতীয় একটি বিমানবাহী রণতরী বহর পাঠানোর পাশাপাশি আরও ৯ থেকে ১০ হাজার মার্কিন সেনা ও নৌসদস্য ওই অঞ্চলের পথে রয়েছেন। এতে চলমান সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

আল জাজিরার প্রতিবেদনে এক মার্কিন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, স্থানীয় সময় রোববার সান দিয়েগো ঘাঁটি থেকে ইউএসএস থিওডোর রুজভেল্ট বিমানবাহী রণতরী বহর মধ্যপ্রাচ্যের উদ্দেশে রওনা হয়েছে। এর পরদিন যাত্রা শুরু করে মার্কিন আইল্যান্ড মেরিন এক্সপেডিশনারি ইউনিট (এমইইউ), যাতে দুই হাজারের বেশি মেরিন সদস্য রয়েছেন।

ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন নৌবহর ও অন্যান্য সামরিক ইউনিট মিলিয়ে অতিরিক্ত ৯ থেকে ১০ হাজার মার্কিন সেনা ও নৌসদস্য মধ্যপ্রাচ্যে যুক্ত হতে পারেন। ওই মার্কিন কর্মকর্তার দাবি, নভেম্বরের শেষ নাগাদ ইরানের আশপাশে তিনটি বিমানবাহী রণতরী এবং দুটি উভচর অবতরণকারী সামরিক দল অবস্থান করতে পারে।

তার মতে, এই মোতায়েনের ফলে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হাতে আরও বিস্তৃত বিকল্প তৈরি হবে।

আল জাজিরার ওয়াশিংটনভিত্তিক প্রতিবেদক তানিয়া নুরি জানান, নতুন মোতায়েনের অংশ হিসেবে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানও রয়েছে। নতুন সদস্যরা যুক্ত হলে মধ্যপ্রাচ্যে আগে থেকেই অবস্থান করা প্রায় ৫০ হাজার মার্কিন সামরিক সদস্যের সঙ্গে আরও বড় সামরিক শক্তি যোগ হবে।

পেন্টাগন ও হোয়াইট হাউসের সূত্রের বরাত দিয়ে নুরি বলেন, কূটনৈতিক আলোচনা যে দিকেই এগোক, ট্রাম্পের জন্য সামরিক বিকল্প খোলা রাখাই এই মোতায়েনের অন্যতম উদ্দেশ্য। এমনকি ইরানের সঙ্গে কোনো সমঝোতা হলেও বর্তমানে মোতায়েন করা সামরিক সম্পদ সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা নেই পেন্টাগনের। মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথও বলেছেন, ট্রাম্প নতুন করে হামলার নির্দেশ দিলে মার্কিন বাহিনী প্রস্তুত রয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যে আগে থেকেই বড় মার্কিন সামরিক উপস্থিতি

মধ্যপ্রাচ্যে কয়েক দশক ধরে সামরিক ঘাঁটি ও সেনা মোতায়েন করে আসছে যুক্তরাষ্ট্র। কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের তথ্য অনুযায়ী, অঞ্চলটির অন্তত ১৯টি স্থানে স্থায়ী ও অস্থায়ী সামরিক স্থাপনা ব্যবহার করে ওয়াশিংটন। বাহরাইন, মিসর, ইরাক, জর্ডান, কুয়েত, কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ কয়েকটি দেশে যুক্তরাষ্ট্রের স্থায়ী সামরিক ঘাঁটি রয়েছে।

১৯৫৮ সালের জুলাইয়ে লেবানন সংকটের সময় প্রথমবারের মতো মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সেনা পাঠানো হয়েছিল। সে সময় লেবাননে প্রায় ১৫ হাজার মেরিন ও সেনা মোতায়েন করা হয়।

২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ হাজার মার্কিন সেনা অবস্থান করছিলেন। চলতি বছরের শুরু থেকেই ওই অঞ্চলে সামরিক উপস্থিতি বাড়িয়ে আসছে ট্রাম্প প্রশাসন। এর অংশ হিসেবে আরব সাগরে ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনসহ বিভিন্ন যুদ্ধজাহাজ পাঠানো হয়।

যুদ্ধ শুরুর আগে ব্যাপক সামরিক প্রস্তুতি

উন্মুক্ত গোয়েন্দা তথ্য ও সামরিক ফ্লাইট পর্যবেক্ষণকারী তথ্যের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারির শুরু থেকে মধ্যপ্রাচ্যে ১২০টির বেশি মার্কিন সামরিক বিমান পাঠানো হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধের পর মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন বিমান শক্তি বাড়ানোর ক্ষেত্রে এটি অন্যতম বড় উদ্যোগ।

মোতায়েন করা বিমানগুলোর মধ্যে রয়েছে ই-৩ সেন্ট্রি এয়ারবর্ন ওয়ার্নিং অ্যান্ড কন্ট্রোল সিস্টেম, এফ-৩৫ স্টেলথ যুদ্ধবিমান, এফ-২২, এফ-১৫ ও এফ-১৬। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বিভিন্ন ঘাঁটি থেকে কার্গো বিমান এবং আকাশে জ্বালানি সরবরাহকারী ট্যাংকারও পাঠানো হয়েছে।

সামরিক বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করছেন, এসব তৎপরতা নিয়মিত ঘাঁটি বদলের চেয়ে দীর্ঘমেয়াদি সামরিক অভিযানের প্রস্তুতির ইঙ্গিত দিতে পারে।

মার্চে উপসাগরীয় অঞ্চলে আরও সেনা পাঠানোর নির্দেশ দেয় পেন্টাগন। এর মধ্যে ইউএসএস ট্রিপোলিকে কেন্দ্র করে ট্রিপোলি অ্যাম্ফিবিয়াস রেডি গ্রুপ ও ৩১তম মেরিন এক্সপেডিশনারি ইউনিট, ইউএসএস বক্সারকে কেন্দ্র করে বক্সার অ্যাম্ফিবিয়াস রেডি গ্রুপ ও ১১তম মেরিন এক্সপেডিশনারি ইউনিট এবং ৮২তম এয়ারবর্ন ডিভিশনের প্রায় দুই হাজার সেনা ছিল।

দুটি মেরিন ইউনিট মিলিয়ে প্রায় ৪ হাজার ৫০০ মেরিন ও নৌসদস্য যুক্ত হয়েছে। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে মধ্যপ্রাচ্যে অতিরিক্ত প্রায় ৭ হাজার মার্কিন সেনা মোতায়েন করা হয়েছে।

নতুন মোতায়েন কি সংঘাত বাড়ার ইঙ্গিত?

মার্কিন সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধিকে সরাসরি যুদ্ধের পরবর্তী ধাপের প্রস্তুতি হিসেবে দেখা হচ্ছে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে বৃহস্পতিবার প্রকাশিত টাইম ম্যাগাজিনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন, মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানে বোমাবর্ষণ আরও বাড়ানো হতে পারে।

তবে কোথায় হামলা চালানো হতে পারে, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানাতে অস্বীকৃতি জানান তিনি। অন্যদিকে কিছু বিশ্লেষকের মতে, ইরানের ওপর চাপ বাড়ানোর পাশাপাশি সামরিক শক্তি প্রদর্শনকে কূটনৈতিক আলোচনার কৌশল হিসেবেও ব্যবহার করতে পারে ওয়াশিংটন।

গত সপ্তাহে ইরান সাত দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার একটি প্রস্তাব দেয়। এর বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্রকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, জব্দ করা ইরানি সম্পদ ছাড় এবং হামলা বন্ধের নিশ্চয়তাসহ কয়েকটি শর্ত পূরণ করতে হবে বলে জানায় তেহরান। ট্রাম্প প্রশাসন সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে।

ওয়াশিংটনের অবস্থান হলো, হরমুজ প্রণালি ও যুদ্ধবিরতির পাশাপাশি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিসহ অন্যান্য বিষয়ও আলোচনায় আনতে হবে। একই সঙ্গে ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপও বাড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। চলতি সপ্তাহে দেশটির রেল ও গাড়ি শিল্পের কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।

মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য, এসব পদক্ষেপের লক্ষ্য ইরানের অবশিষ্ট রাজস্বের উৎস আরও সংকুচিত করা। এর আগে গত মাসেও ইরান এবং দেশটির সঙ্গে বাণিজ্য করা কয়েকটি দেশের বিরুদ্ধে ব্যাপক নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করেছিল ওয়াশিংটন।

কূটনৈতিক আলোচনাতেও বড় অগ্রগতি নেই

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে পরোক্ষ শান্তি আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত বড় কোনো অগ্রগতি হয়নি। গত মাসে নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে কাতারের মধ্যস্থতায় অনুষ্ঠিত আলোচনায় হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়টি সবচেয়ে জটিল ইস্যুগুলোর একটি হয়ে ওঠে।

ওই আলোচনায় ইরান সাত দিনের একটি রোডম্যাপ প্রস্তাব করে। এতে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া ও পারমাণবিক আলোচনা পুনরায় শুরুর বিনিময়ে মার্কিন নৌ অবরোধ বন্ধ, নিষেধাজ্ঞা শিথিল এবং লেবানন ও ইয়েমেনসহ অঞ্চলে যুদ্ধবিরতির দাবি জানায় তেহরান।

ট্রাম্প সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। জাতিসংঘে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক ওয়াল্টজ এনবিসিকে বলেন, ইরানের জব্দ করা অর্থ ফেরত দেওয়া ও নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি মেনে নেওয়া সম্ভব নয়। তার দাবি, এসব শুধু যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা নয়, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার সঙ্গেও সম্পর্কিত।

এর জবাবে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেন, যুদ্ধ পুনরায় শুরু হলে তেহরান তার জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তিনি বলেন, নিউইয়র্কে ইরান যুদ্ধ শুরু বা চালিয়ে যাওয়ার জন্য যায়নি, বরং শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য গিয়েছিল।

এদিকে বৃহস্পতিবার টেক্সাসের ডেন্টনে এক অনুষ্ঠানে ট্রাম্প বলেন, বর্তমান সংঘাত খুব শিগগিরই শেষ হতে পারে। তবে তেহরান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তিতে না এলে কঠোর পরিণতির হুঁশিয়ারিও দেন তিনি।

ট্রাম্প একই সঙ্গে প্রশ্ন তোলেন, ইরান কোনো চুক্তি করলে সেটি বাস্তবায়ন করবে কি না। তার বক্তব্য, কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি করলে তা মানার নিশ্চয়তা থাকে; কিন্তু ইরানের ক্ষেত্রে চুক্তি বাস্তবায়ন নিয়ে তার সন্দেহ রয়েছে।

ফলে একদিকে হরমুজ প্রণালি, নিষেধাজ্ঞা ও পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে কূটনৈতিক দর-কষাকষি চলছে, অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যে বাড়ছে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি। কূটনৈতিক আলোচনা ও সামরিক মোতায়েন—এই দুই ধারার পরবর্তী গতিপথই আগামী দিনগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

সূত্র: আল জাজিরা

Facebook Comments Box
Advertise with us
এ বিভাগের আরও খবর


আর্কাইভ ক্যালেণ্ডার
Su Mo Tu We Th Fr Sa
Advertise with us
আরও বাংলা-ভয়েজ সংবাদ