সম্পূর্ণ নিউজ বাংলা-ভয়েজ

ফিচার
১:৫৭ অপরাহ্ন, ৩১ আগস্ট ২০২৬

আফগানিস্তান থেকে বের হতে না পারার ভুল কি ইরানেও করবে যুক্তরাষ্ট্র?

আফগানিস্তানে প্রায় দুই দশকের যুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছিল সেখান থেকে বেরিয়ে আসা। পাঁচ বছর আগে বিশৃঙ্খলা ও পরাজয়ের মধ্য দিয়ে সেই দীর্ঘ যুদ্ধের অবসান হলেও, যুদ্ধ শুরুর সময় যে নিরাপত্তা-ভিত্তিক আশঙ্কাগুলো দেখিয়ে মার্কিন নেতৃত্ব বারবার সেনা প্রত্যাহার ঠেকিয়েছিল, পরে তার অনেকটাই বাস্তব হয়নি। এখন একই ধরনের প্রশ্ন উঠছে ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের […]

আফগানিস্তান থেকে বের হতে না পারার ভুল কি ইরানেও করবে যুক্তরাষ্ট্র?

ছবি: সংগৃহীত

নিজস্ব প্রতিবেদক
৬ মিনিটে পড়ুন |

আফগানিস্তানে প্রায় দুই দশকের যুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছিল সেখান থেকে বেরিয়ে আসা। পাঁচ বছর আগে বিশৃঙ্খলা ও পরাজয়ের মধ্য দিয়ে সেই দীর্ঘ যুদ্ধের অবসান হলেও, যুদ্ধ শুরুর সময় যে নিরাপত্তা-ভিত্তিক আশঙ্কাগুলো দেখিয়ে মার্কিন নেতৃত্ব বারবার সেনা প্রত্যাহার ঠেকিয়েছিল, পরে তার অনেকটাই বাস্তব হয়নি।

এখন একই ধরনের প্রশ্ন উঠছে ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন সামরিক সংঘাত নিয়ে। সামরিক অভিযান দ্রুত শেষ করার প্রত্যাশা থাকলেও পরিস্থিতি ক্রমেই দীর্ঘমেয়াদি হওয়ার আশঙ্কা তৈরি করছে। ফলে আফগানিস্তানের অভিজ্ঞতা সামনে রেখে প্রশ্ন উঠেছে—যুক্তরাষ্ট্র কি আবারও এমন একটি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ছে, যেখান থেকে বেরিয়ে আসাই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে কঠিন হয়ে উঠবে?

দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বৈশ্বিক পরাশক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় প্রতিটি বড় যুদ্ধেই একপর্যায়ে যুদ্ধ শেষ করা কিংবা সরে আসার প্রশ্ন সামনে এসেছে।

নিরাপত্তা নিয়ে গবেষণা করা র‌্যান্ড করপোরেশনের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক অ্যান্ড্রু আর. হোয়েন বলেন, ‘গত কয়েক দশক ধরে আমরা যে যুদ্ধগুলোতে জড়িয়ে আছি তার বেশিরভাগই মূলত ‘সাম্রাজ্যের পাহারা দেওয়া।’ হোহন বলেন, ‘আমরা কোনো অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে যুদ্ধ করছি না।’

বিন লাদেন নিহত হওয়ার পরও আফগান যুদ্ধ থামেনি

আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের সবচেয়ে বড় সুযোগ তৈরি হয়েছিল ২০১১ সালের মে মাসে, যখন মার্কিন অভিযানে আল-কায়েদার নেতা ওসামা বিন লাদেন নিহত হন।

এর আগে প্রায় এক দশকের ড্রোন হামলায় আল-কায়েদা ব্যাপকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছিল। একই সময়ে আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হস্তক্ষেপের অন্যতম প্রধান কারণ—তালেবানকে ক্ষমতা থেকে সরানো এবং আল-কায়েদাকে আশ্রয় দেওয়া বন্ধ করা—বাস্তবে স্থায়ীভাবে অর্জন করা কঠিন হয়ে উঠেছিল।

পরে আফগানিস্তানে মার্কিন কমান্ডারদের উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করা কার্টার মালকাসিয়ান লিখেছেন, সেই সময়কার পরিস্থিতি সম্পর্কে আজকের জ্ঞান থাকলে তিনি এবং আরও অনেক মার্কিন কর্মকর্তা আগেই সেনা প্রত্যাহারের পক্ষে আরও জোরালো অবস্থান নিতেন।

কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্ব যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে ছিল। এর পেছনে অন্যতম কারণ ছিল বিশ্বমঞ্চে মার্কিন বিশ্বাসযোগ্যতা হারানোর আশঙ্কা। পাশাপাশি আফগান মিত্রদের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং যুদ্ধ থেকে সরে গেলে নিহত ও আহত মার্কিন সেনাদের ত্যাগকে অসম্মান করা হবে—এমন ধারণাও কাজ করেছিল।

মালকাসিয়ানের মতে, অনেক সামরিক কর্মকর্তার কাছে যুদ্ধ থেকে সরে আসার চিন্তাটিই তাদের দীর্ঘদিনের প্রশিক্ষণ ও সামরিক অভিজ্ঞতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক ছিল। তিনি লিখেছেন, ‘সহজভাবে বললে, আমেরিকানরা আগে আফগানিস্তান ছাড়েনি কারণ মার্কিন সামরিক বাহিনী জয়ের জন্যই লড়াই করে।’

যুদ্ধের লক্ষ্যও ধীরে ধীরে বদলে যায়

২০১১ সালের পর আফগানিস্তানে মার্কিন সেনা সংখ্যা কমতে শুরু করলেও যুদ্ধ শেষ হয়নি। তালেবান বুঝতে পেরেছিল, তাদের মূল লক্ষ্য ছিল মার্কিন সেনাদের এবং যুদ্ধের ব্যয় বহনে ক্লান্ত হয়ে পড়া মার্কিন জনগণের ধৈর্যের চেয়ে বেশি সময় টিকে থাকা।

তালেবানকে সামরিকভাবে পরাজিত করার সম্ভাবনা যত কমতে থাকে, মার্কিন নীতিনির্ধারকেরাও যুদ্ধের লক্ষ্য পরিবর্তন করতে শুরু করেন। সামরিক বিজয়ের পরিবর্তে হতাহতের সংখ্যা কমানো, যুদ্ধের ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং দুর্নীতিগ্রস্ত ও অজনপ্রিয় আফগান সরকারকে টিকিয়ে রাখার ওপর গুরুত্ব বাড়ে।

পরিমিত মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির পক্ষে থাকা সংগঠন ডিফেন্স প্রায়োরিটিজ-এর মিডল ইস্ট প্রোগ্রামের পরিচালক রোজমেরি কেলানিক পরিস্থিতিটিকে একটি আইসিইউতে থাকা রোগীর সঙ্গে তুলনা করেন। তিনি বলেন, ‘তারা আইসিইউ-এর সেই ডাক্তারের মতো যিনি জানেন যে রোগী মারা যাবে। তারা কেবল আশা করছেন যেন রোগী তাদের ডিউটি বা শিফটের পরে মারা যায়। তারা চান না এটি তাদের দায়িত্বপালনকালীন সময়ে ঘটুক।’

বিন লাদেন নিহত হওয়ার পরও আফগান যুদ্ধ আরও প্রায় এক দশক চলেছে। এই সময়ে আরও ৮৬৮ জন মার্কিন সেনা সদস্য নিহত হন।

যুদ্ধের শেষ পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করা মার্কিন কমান্ডারদের অনেকেই বুঝতে পেরেছিলেন যে তাদের এমন এক পরিস্থিতিতে দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে, যেখানে ব্যর্থতার সম্ভাবনাই বেশি। আফগানিস্তানে শেষ মার্কিন কমান্ডার জেনারেল অস্টিন এস. মিলার ২০১৮ সালে দায়িত্ব নেওয়ার সময়কার মানসিকতা স্মরণ করে বলেছিলেন, তিনি আশা করেছিলেন দায়িত্ব শেষে তিনি ‘খুবই ক্লান্ত’ হয়ে ফিরবেন এবং তার ‘মর্যাদা হ্রাস পাবে’।

ইরানেও কি আফগানিস্তানের পুনরাবৃত্তি?

আফগানিস্তানের অভিজ্ঞতার পর যুক্তরাষ্ট্র এবার ইরানকে ঘিরে নতুন এক সামরিক সংকটে পড়েছে। সামরিক অভিযান শুরুর আগে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেছিলেন, ইরানের যুদ্ধ আফগানিস্তান বা ইরাকের মতো দীর্ঘ ও জটিল হবে না।

দুই যুদ্ধেই তরুণ আর্মি ন্যাশনাল গার্ড কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করা হেগসেথ সেসব যুদ্ধকে ‘জটিল ও দীর্ঘস্থায়ী ফাঁদ’ হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন।

ইরানের ক্ষেত্রে তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, অভিযান হবে ‘লেজার-ফোকাসড’, প্রাণঘাতী, দ্রুত এবং ‘নির্ণায়ক’।

তিনি বলেছিলেন, ‘এটি ইরাক নয়। এটি অন্তহীন নয়।’

কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি সেই প্রত্যাশাকে চ্যালেঞ্জ করছে। মার্কিন হামলার জবাবে ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়। পরে জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন স্বীকার করেন, শুধু মার্কিন বোমা ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে ইরানকে পরাজিত করা কিংবা গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ পুরোপুরি বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া সম্ভব নাও হতে পারে।

এরপর যুক্তরাষ্ট্র বিমান হামলার পাশাপাশি হরমুজ প্রণালিতে ইরানের রপ্তানির ওপর নৌ অবরোধ ও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে চাপ বাড়ানোর চেষ্টা করছে। কিছু জাহাজ ও তেল রপ্তানি আবারও প্রণালি দিয়ে চলাচল শুরু করার প্রাথমিক লক্ষণ দেখা গেলেও, মার্কিন সামরিক কর্মকর্তারা এখন আর দ্রুত বিজয়ের কথা বলছেন না।

বরং ইরানের ওপর কয়েক মাস বা তারও বেশি সময় ধরে চাপ বজায় রাখার সম্ভাবনার কথা বলা হচ্ছে।

মার্কিন নৌবাহিনী এমনিতেই দীর্ঘমেয়াদি মোতায়েনের কারণে চাপের মধ্যে রয়েছে। এরপরও অবরোধ কতদিন চালানো সম্ভব—এমন প্রশ্নের জবাবে হেগসেথ বলেছেন, ‘যতদিন প্রয়োজন, ততদিন—অনির্দিষ্টকাল।’

যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসাও বড় রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত

ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের চ্যালেঞ্জের সঙ্গে আফগানিস্তানের কিছু মিল রয়েছে। তালেবান তাদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য লড়াই করেছিল। ইরানের নেতৃত্বও এখন নিজেদের টিকে থাকার লড়াই করছে।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিকোণ থেকে ইরান যুদ্ধে ঝুঁকি কিছু ক্ষেত্রে আফগানিস্তানের তুলনায় কম হতে পারে। এর ফলে যুদ্ধ থেকে সরে আসার রাজনৈতিক ও সামরিক মূল্যও তুলনামূলকভাবে কম হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

সামরিক বিশেষজ্ঞ থমাস জি. মাহনকেনের মতে, যুক্তরাষ্ট্র চাইলে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দিতে পারে। তবে ইরান কয়েক দশক ধরে ওই অঞ্চলে নিজেদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী করেছে। ফলে সেখানে স্থলবাহিনী পাঠিয়ে অভিযান চালানোর প্রয়োজন দেখা দিতে পারে।

আর সেটিই বড় ঝুঁকি। কারণ স্থল অভিযান শুরু হলে প্রাণহানি ও অর্থনৈতিক ব্যয় ব্যাপকভাবে বেড়ে যেতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং যুদ্ধবিরোধী মার্কিন জনগণ কতটা সামরিক ও রাজনৈতিক মূল্য দিতে প্রস্তুত থাকবেন, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আফগান যুদ্ধের পরাজয়কে বীরত্বের গল্পে তুলে ধরা

আফগানিস্তান থেকে মার্কিন বাহিনী প্রত্যাহারের পাঁচ বছর পূর্তিতে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ তিনজন অবসরপ্রাপ্ত মেরিন সেনাকে বীরত্বের জন্য পদক দেন। তাদের মধ্যে দুজন কাবুল বিমানবন্দরে আত্মঘাতী বোমা হামলায় গুরুতর আহত হয়েছিলেন। আহত অবস্থাতেও তারা অন্যদের নিরাপদে সরিয়ে নিতে ভূমিকা রাখেন।

অনুষ্ঠানে হেগসেথ তাদের বীরত্বের প্রশংসা করেন এবং দীর্ঘদিন ধরে প্রাপ্য পদক তুলে দেন।

তবে বিশ্লেষণ অনুযায়ী, অনুষ্ঠানের আরেকটি উদ্দেশ্যও ছিল—আফগানিস্তানের দীর্ঘ ও হতাশাজনক যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পরাজয়কে সেখানে দায়িত্ব পালনকারী সেনাদের ব্যক্তিগত বীরত্ব ও সাফল্যের গল্প হিসেবে তুলে ধরা।

হেগসেথ মেরিন সেনাদের উদ্দেশে বলেন, তারা একটি ‘প্রাণঘাতী, গর্বিত ও অপরাজিত বাহিনীর অগ্রভাগ’।

তবে পুরো আয়োজনের মধ্যে একটি কঠিন বাস্তবতা অনুচ্চারিতই থেকে যায়—আফগানিস্তানে দীর্ঘ প্রায় দুই দশকের যুদ্ধের পর শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রকে সেখান থেকে সরে আসতে হয়েছিল এবং তালেবান আবারও দেশটির নিয়ন্ত্রণ নেয়।

আফগানিস্তানের সেই অভিজ্ঞতাই এখন ইরান নিয়ে মার্কিন নীতিনির্ধারকদের সামনে সবচেয়ে বড় সতর্কবার্তা হয়ে দাঁড়িয়েছে। দ্রুত ও নির্ণায়ক সামরিক অভিযানের লক্ষ্য যদি দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতে পরিণত হয়, তাহলে যুদ্ধ শুরু করার চেয়ে সেটি শেষ করাই আবারও ওয়াশিংটনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।

Facebook Comments Box
Advertise with us
এ বিভাগের আরও খবর


আর্কাইভ ক্যালেণ্ডার
Su Mo Tu We Th Fr Sa
Advertise with us
আরও বাংলা-ভয়েজ সংবাদ