সম্পূর্ণ নিউজ বাংলা-ভয়েজ

অর্থনীতি
৪:০১ পিএম, ১৬ অক্টোবর ২০২৬

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে ক্ষতি ৫০ হাজার কোটি টাকার, ক্ষতিপূরণ চায় বাংলাদেশ

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে গত সাত মাসে জ্বালানি ও সার আমদানিতে বাংলাদেশের অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে ৪১২ কোটি ডলার, যা প্রতি ডলার ১২২ টাকা হিসাবে প্রায় ৫০ হাজার ২৬৪ কোটি টাকা। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে এ দুই পণ্যের আমদানিতে প্রতি মাসে আরও প্রায় ৬০ কোটি ডলার অতিরিক্ত ব্যয় হতে পারে। এই বিপুল আর্থিক চাপ সামাল দিতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা […]

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে ক্ষতি ৫০ হাজার কোটি টাকার, ক্ষতিপূরণ চায় বাংলাদেশ

ছবি: সংগৃহীত

নিজস্ব প্রতিবেদক
৬ মিনিটে পড়ুন |

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে গত সাত মাসে জ্বালানি ও সার আমদানিতে বাংলাদেশের অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে ৪১২ কোটি ডলার, যা প্রতি ডলার ১২২ টাকা হিসাবে প্রায় ৫০ হাজার ২৬৪ কোটি টাকা। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে এ দুই পণ্যের আমদানিতে প্রতি মাসে আরও প্রায় ৬০ কোটি ডলার অতিরিক্ত ব্যয় হতে পারে।

এই বিপুল আর্থিক চাপ সামাল দিতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা চাইছে বাংলাদেশ। একই সঙ্গে যুদ্ধের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও সংঘাতে সরাসরি জড়িত নয়—এমন দেশগুলোর ক্ষতির জন্য ক্ষতিপূরণের বিষয়টিও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচনায় এসেছে।

থাইল্যান্ডের ব্যাংককে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভার ফাঁকে শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) উন্নয়নশীল দেশগুলোর ক্ষয়ক্ষতি ও আন্তর্জাতিক সহায়তা নিয়ে আলোচনায় বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বিষয়টি তুলে ধরা হয়। প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর জ্বালানি ও সার আমদানিতে বাড়তি ব্যয়ের হিসাব তুলে ধরে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর পাশে দাঁড়াতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানান।

তবে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকার এই বাড়তি ব্যয় ক্ষতিপূরণ হিসেবে বাংলাদেশ পাবে—এমন কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের কাছ থেকে বাড়তি অর্থায়ন পাওয়ার উদ্যোগ চলছে। কিন্তু ঋণ, অনুদান বা জরুরি সহায়তার অর্থকে সরাসরি যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ হিসেবে বিবেচনা করা যায় না।

যুদ্ধের ধাক্কায় বাড়ছে আমদানি ব্যয়

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাব সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠছে জ্বালানি ও সার আমদানির ব্যয়ে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়লে বিদ্যুৎ উৎপাদন, পরিবহন ও শিল্পকারখানা পরিচালনার খরচ বেড়ে যায়। একইভাবে সারের দাম বাড়লে কৃষি উৎপাদনের ব্যয় এবং সরকারের ভর্তুকির চাপও বাড়তে পারে। শেষ পর্যন্ত এসব ব্যয়ের একটি অংশ পণ্য ও সেবার দাম বৃদ্ধির মাধ্যমে সাধারণ মানুষের ওপর পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীরের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, যুদ্ধ অব্যাহত থাকলে জ্বালানি ও সার আমদানিতে প্রতি মাসে প্রায় ৬০ কোটি ডলার অতিরিক্ত ব্যয় হতে পারে। যুদ্ধ যত দীর্ঘ হবে, দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ তত বাড়বে।

উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগে দুর্বলতা ও আর্থিক খাতের সংকটের মধ্যে আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি বাংলাদেশের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। এতে বৈদেশিক মুদ্রার জোগান নিশ্চিত করা এবং সরকারি বাজেটের ভারসাম্য রক্ষা আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

বাংলাদেশের যুক্তি, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের সিদ্ধান্তে সরাসরি অংশ না নিলেও আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও সারের মূল্যবৃদ্ধির কারণে উন্নয়নশীল দেশগুলোকে বড় আর্থিক ক্ষতি বহন করতে হচ্ছে। তাই এসব দেশের জন্য আন্তর্জাতিক সহায়তা বাড়ানো প্রয়োজন। বিশেষ করে আমদানিনির্ভর অর্থনীতির দেশগুলোর বাড়তি ব্যয় সামলাতে সহজ শর্তে অর্থায়ন, অনুদান ও জরুরি সহায়তার ব্যবস্থা করা জরুরি।

৩০–৪০ দেশকে সহায়তার প্রস্তুতি বিশ্বব্যাংকের

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে জ্বালানি ও অন্যান্য পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কা সামলাতে ৩০ থেকে ৪০টি দেশের সঙ্গে সম্ভাব্য জরুরি সহায়তা নিয়ে আলোচনা করছে বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটির প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গা গণমাধ্যমকে এ তথ্য জানিয়েছেন।

তিনি জানান, পরিস্থিতির আরও অবনতি হলে সংকট মোকাবিলায় সহায়তার পরিমাণ সর্বোচ্চ ১০০ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। প্রাথমিকভাবে ২৫ বিলিয়ন ডলারের একটি সংকটকালীন তহবিলের ব্যবস্থা করা হয়েছে। পাশাপাশি চলমান ও অনুমোদিত প্রকল্পের অর্থ পুনর্বিন্যাস করেও ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোকে সহায়তা দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

বাংলাদেশের জন্য বিশ্বব্যাংকের এ উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ। তবে সম্ভাব্য অর্থায়ন পাওয়ার ক্ষেত্রে দেশের প্রয়োজন, অর্থ ব্যবহারের পরিকল্পনা এবং অর্থায়নের শর্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। জ্বালানি ও সার আমদানির বাড়তি ব্যয় সামলাতে অর্থায়ন পাওয়া গেলে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ কিছুটা কমতে পারে।

এদিকে নিয়মিত সহায়তার বাইরে আগামী তিন বছরে বিশ্বব্যাংকের কাছে অতিরিক্ত ১০ বিলিয়ন ডলার অর্থায়ন চেয়েছে বাংলাদেশ। পাশাপাশি আইএমএফের সঙ্গে নতুন তিন বছর মেয়াদি ৪৫০ কোটি ডলারের ঋণ কর্মসূচি নিয়েও আলোচনা চলছে।

তবে এসব অর্থায়ন যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ হিসেবে নির্ধারিত নয়। বরং অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলা ও পুনরুদ্ধারের বৃহত্তর উদ্যোগের অংশ।

ক্ষতিপূরণ নাকি ঋণ—প্রশ্ন অর্থের শর্ত নিয়ে

যুদ্ধের কারণে বাংলাদেশের বাড়তি ব্যয় প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছালেও এই অর্থ ক্ষতিপূরণ হিসেবে আদায়ের কোনো নিশ্চিত ব্যবস্থা এখনো সামনে আসেনি। তাই আন্তর্জাতিক সহায়তা চাওয়ার পাশাপাশি কী ধরনের অর্থায়ন দেশের জন্য সবচেয়ে কার্যকর হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

নতুন ঋণ পেলে তাৎক্ষণিকভাবে আমদানি ব্যয়ের চাপ সামলানো সহজ হতে পারে। কিন্তু ঋণের অর্থ ভবিষ্যতে সুদসহ পরিশোধ করতে হবে, যা দীর্ঘ মেয়াদে বৈদেশিক ঋণের দায় বাড়াতে পারে। অন্যদিকে, অনুদান বা সহজ শর্তে অর্থায়ন পাওয়া গেলে তুলনামূলকভাবে কম দায় তৈরি হবে।

বাংলাদেশের জন্য তাই শুধু অর্থের পরিমাণ নয়, অর্থায়নের শর্ত, ব্যবহার ও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বিবেচনা করাও জরুরি। জ্বালানি সরবরাহ সচল রাখা, কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হওয়া ঠেকানো এবং মূল্যস্ফীতির চাপে থাকা নিম্ন আয়ের মানুষের সুরক্ষা নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত সহায়তার প্রধান লক্ষ্য।

যুদ্ধের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পুরোনো অর্থনৈতিক সংকট

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট নতুন চাপের পাশাপাশি আগের সরকারের আমলে তৈরি হওয়া দুর্নীতি, ব্যাংকিং খাতের অনিয়ম ও দীর্ঘস্থায়ী উচ্চ মূল্যস্ফীতির প্রভাবও কাটিয়ে উঠতে হচ্ছে বাংলাদেশকে বলে জানিয়েছেন ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।

আইএমএফের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকট এবং উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। নিম্ন আয়ের মানুষ সবচেয়ে বেশি চাপে রয়েছেন। এ পরিস্থিতিতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, দারিদ্র্য মোকাবিলা এবং ব্যাংকিং খাতে আস্থা ফিরিয়ে আনতে সরকার কাজ করছে।

তাঁর মতে, যুদ্ধ বাংলাদেশের সৃষ্টি করা কোনো সংকট নয়। কিন্তু এর প্রভাব মোকাবিলার দায়িত্ব সরকারকে নিতে হচ্ছে। জ্বালানি ও বিদ্যুতের ব্যয় বৃদ্ধির চাপ যাতে সরাসরি সাধারণ মানুষের ওপর না পড়ে, সে বিষয়েও সরকার সতর্ক রয়েছে।

দারিদ্র্য মোকাবিলায় ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের মতো কর্মসূচির কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, প্রকৃত উপকারভোগীদের কাছে সহায়তা পৌঁছানো গেলে নিম্ন আয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ধরে রাখা এবং নতুন করে দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে পড়া ঠেকানো সম্ভব হবে।

একই সঙ্গে রাজস্ব আদায় বাড়ানো, ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা এবং উৎপাদন ও রপ্তানিমুখী শিল্পে বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার।

কর্মসংস্থানেও বড় চ্যালেঞ্জ

যুদ্ধের প্রভাবের পাশাপাশি উন্নয়নশীল দেশগুলোর সামনে কর্মসংস্থান সৃষ্টির বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে বলে জানিয়েছেন বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গা।

তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আগামী ১০ থেকে ১৫ বছরে উন্নয়নশীল ও উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোতে প্রায় ১২০ কোটি তরুণ কর্মক্ষম বয়সে পৌঁছাবে। কিন্তু বর্তমান ধারায় তাদের জন্য আনুমানিক ৪০ কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা সম্ভব হতে পারে। ফলে প্রায় ৮০ কোটি কর্মসংস্থানের ঘাটতির আশঙ্কা রয়েছে।

ব্যাংককে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের বার্ষিক সভায় তিনি বলেন, এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকারি অর্থায়নের পাশাপাশি বেসরকারি বিনিয়োগ, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং উৎপাদনশীল খাতের সম্প্রসারণ জরুরি।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও যুদ্ধের কারণে আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির প্রভাব শিল্পের উৎপাদন খরচ, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে পড়তে পারে। এ পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক সহায়তার পাশাপাশি উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো এবং অর্থনীতির সক্ষমতা শক্তিশালী করা প্রয়োজন।

সব মিলিয়ে, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ বাংলাদেশের জন্য শুধু জ্বালানি আমদানির ব্যয় বৃদ্ধির সংকট নয়; এটি বৈদেশিক মুদ্রার জোগান, সরকারি বাজেট, কৃষি উৎপাদন, মূল্যস্ফীতি ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে যুক্ত একটি বড় অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ। সাত মাসে জ্বালানি ও সার আমদানিতে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকার বাড়তি ব্যয়ের হিসাব সেই চাপের মাত্রা তুলে ধরছে।

এখন বাংলাদেশের লক্ষ্য আন্তর্জাতিক সহযোগীদের কাছ থেকে কার্যকর অর্থায়ন নিশ্চিত করা। তবে যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ দাবি, জরুরি সহায়তা ও ঋণের মধ্যে পার্থক্য স্পষ্ট রেখে দেশের স্বার্থে সবচেয়ে টেকসই সমাধান খুঁজে বের করাই হবে গুরুত্বপূর্ণ।

Facebook Comments Box
Advertise with us
এ বিভাগের আরও খবর


আর্কাইভ ক্যালেণ্ডার
Su Mo Tu We Th Fr Sa
Advertise with us
আরও বাংলা-ভয়েজ সংবাদ