মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের দুই গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু ভিন্নধারার মিত্র—ইসরায়েল ও সৌদি আরবের টানা এক সপ্তাহের কূটনৈতিক তৎপরতার পর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরুর সিদ্ধান্ত নেন বলে জানিয়েছে প্রভাবশালী মার্কিন দৈনিক ওয়াশিংটন পোস্ট। বিভিন্ন সূত্রের বরাতে পত্রিকাটি জানায়, গত এক মাসে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান একাধিকবার ব্যক্তিগতভাবে ট্রাম্পকে ফোন করে ইরানের বিরুদ্ধে হামলার পক্ষে […]
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান। ছবি: এএফপি
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের দুই গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু ভিন্নধারার মিত্র—ইসরায়েল ও সৌদি আরবের টানা এক সপ্তাহের কূটনৈতিক তৎপরতার পর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরুর সিদ্ধান্ত নেন বলে জানিয়েছে প্রভাবশালী মার্কিন দৈনিক ওয়াশিংটন পোস্ট।
বিভিন্ন সূত্রের বরাতে পত্রিকাটি জানায়, গত এক মাসে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান একাধিকবার ব্যক্তিগতভাবে ট্রাম্পকে ফোন করে ইরানের বিরুদ্ধে হামলার পক্ষে জোরালো অবস্থান তুলে ধরেন। যদিও প্রকাশ্যে তিনি কূটনৈতিক সমাধানের আহ্বান জানিয়ে আসছিলেন।
একই সময়ে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দীর্ঘদিন ধরেই ইরানকে ইসরায়েলের অস্তিত্বের জন্য হুমকি হিসেবে উল্লেখ করে দেশটির বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপের আহ্বান জানিয়ে আসছিলেন।
এই দুই দেশের সম্মিলিত চাপই ট্রাম্পকে ইরানের রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও সামরিক কাঠামোর ওপর বড় ধরনের বিমান হামলা চালাতে উদ্বুদ্ধ করে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযানের প্রথম ঘণ্টাতেই আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ একাধিক শীর্ষ ইরানি কর্মকর্তার প্রাণহানি ঘটে।
মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মূল্যায়নে বলা হয়েছিল, আগামী এক দশকের মধ্যে ইরান সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডের জন্য বড় ধরনের সামরিক হুমকি হয়ে উঠবে—এমন সম্ভাবনা কম। তবুও এই অভিযান পরিচালনা করা হয়, যা যুক্তরাষ্ট্রের প্রচলিত পররাষ্ট্র ও সামরিক নীতির বড় ধরনের ব্যতিক্রম হিসেবে দেখা হচ্ছে।
শনিবারের এই হামলাকে গত কয়েক দশকের মার্কিন কৌশল থেকে একটি বড় বিচ্যুতি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে, কারণ এতদিন ওয়াশিংটন কোনো দেশের শাসনব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ শক্তি প্রয়োগ করে উৎখাত করার পথ এড়িয়ে চলত। তবে ট্রাম্প প্রশাসনের এই অভিযান ছিল আগের যেকোনো সামরিক অভিযানের তুলনায় অনেক বেশি বিস্তৃত ও আক্রমণাত্মক।
ইরানের বিভিন্ন স্থাপনায় যখন মার্কিন বোমাবর্ষণ চলছিল, তখন এক ভিডিও বার্তায় ট্রাম্প ইরানিদের উদ্দেশে বলেন, ‘আজ রাতে আমি এমন কিছু করতে যাচ্ছি, যা অন্য কোনো প্রেসিডেন্ট করতে রাজি হননি। এখন আপনাদের কাছে এমন একজন প্রেসিডেন্ট আছেন, যিনি আপনাদের কাঙ্ক্ষিত পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত। এখন দেখা যাক, আপনারা কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানান।’
এই হামলার পেছনে সৌদি আরবের চাপ আসে এমন এক সময়ে, যখন ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং তাঁর জামাতা জ্যারেড কুশনার ইরানের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে তেহরানের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছিলেন।
সেই আলোচনার মধ্যেই সৌদি আরব একটি বিবৃতি দেয়, যা আসে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ও ইরানি প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের ফোনালাপের পর। বিবৃতিতে বলা হয়, ইরানের ওপর হামলার জন্য সৌদি আকাশসীমা বা ভূখণ্ড ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না।
তবে সংবেদনশীল এই বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনায় সৌদি যুবরাজ সতর্ক করে বলেন—২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণের পর মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের এই বৃহত্তম সামরিক উপস্থিতির সুযোগ কাজে না লাগালে ভবিষ্যতে ইরান আরও শক্তিশালী ও বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।
এই অবস্থানকে সমর্থন জানান সৌদি প্রতিরক্ষামন্ত্রী এবং যুবরাজের ভাই খালিদ বিন সালমান। তিনি জানুয়ারিতে ওয়াশিংটনে এক রুদ্ধদ্বার বৈঠকে মার্কিন কর্মকর্তাদের হামলা না চালানোর সম্ভাব্য পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করেছিলেন।
বিশ্লেষকদের মতে, সৌদি নেতৃত্বের এই দ্বিমুখী অবস্থানের পেছনে একদিকে দেশের গুরুত্বপূর্ণ তেল অবকাঠামোকে ইরানের সম্ভাব্য প্রতিশোধ থেকে রক্ষা করার চেষ্টা এবং অন্যদিকে তেহরানকে রিয়াদের দীর্ঘদিনের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখার বাস্তবতা কাজ করেছে। শিয়া প্রধান ইরান ও সুন্নি নেতৃত্বাধীন সৌদি আরবের মধ্যকার দীর্ঘস্থায়ী প্রতিদ্বন্দ্বিতা পুরো অঞ্চলে বহু প্রক্সি সংঘাতের জন্ম দিয়েছে।
শনিবার মার্কিন হামলার পর ইরান সৌদি আরবের ওপর প্রতিশোধমূলক আঘাত হানে। এর জবাবে রিয়াদ তীব্র নিন্দা জানিয়ে একটি বিবৃতি প্রকাশ করে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর ও চূড়ান্ত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানায়।