‘প্রিয় নিউইয়র্কবাসী, আজ থেকে আমাদের জন্য শুরু হচ্ছে এক নতুন অধ্যায়।’নিউইয়র্ক সিটির মেয়র হিসেবে শপথ নেওয়ার পর উদ্বোধনী ভাষণের শুরুতেই এভাবেই নিজের অঙ্গীকার তুলে ধরেন জোহরান মামদানি। নতুন মেয়রের মতে, এই নতুন অধ্যায়ে সিটি হল সাহসের সঙ্গে জনগণের জীবনমান উন্নয়নে কাজ করবে। তাঁর প্রশাসন হবে স্বচ্ছ, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং ধনী–দরিদ্র নির্বিশেষে সবার জন্য সমানভাবে দায়িত্বশীল। মামদানি […]
ছবি - সংগৃহীত
‘প্রিয় নিউইয়র্কবাসী, আজ থেকে আমাদের জন্য শুরু হচ্ছে এক নতুন অধ্যায়।’
নিউইয়র্ক সিটির মেয়র হিসেবে শপথ নেওয়ার পর উদ্বোধনী ভাষণের শুরুতেই এভাবেই নিজের অঙ্গীকার তুলে ধরেন জোহরান মামদানি।
নতুন মেয়রের মতে, এই নতুন অধ্যায়ে সিটি হল সাহসের সঙ্গে জনগণের জীবনমান উন্নয়নে কাজ করবে। তাঁর প্রশাসন হবে স্বচ্ছ, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং ধনী–দরিদ্র নির্বিশেষে সবার জন্য সমানভাবে দায়িত্বশীল। মামদানি বলেন, নিউইয়র্কের প্রায় ৮৫ লাখ মানুষ এক হয়ে একটি নতুন রাজনৈতিক আখ্যান রচনা করবে।
হিমাঙ্কের নিচে তাপমাত্রা, তবু জনসমুদ্র
নিউইয়র্কের মেয়রের অভিষেক চলাকালে তাপমাত্রা ছিল হিমাঙ্কের নিচে। কনকনে শীত উপেক্ষা করেও লোয়ার ম্যানহাটনের সিটি হলের সামনে হাজার হাজার মানুষ জড়ো হন নতুন মেয়রকে স্বাগত জানাতে। এই অভিষেকের দিনই সাবেক মেয়র এরিক অ্যাডামসের জারি করা ইসরায়েল-সমর্থিত একটি নির্বাহী আদেশ বাতিল করেন মামদানি।
নতুন বছরের প্রথম দিন বৃহস্পতিবার আনুষ্ঠানিকভাবে মেয়রের দায়িত্ব গ্রহণ করেন ৩৪ বছর বয়সী মামদানি। সিটি হলের উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে আয়োজিত অভিষেক অনুষ্ঠানে জনসমক্ষে পবিত্র কোরআন ছুঁয়ে শপথ নেন তিনি। এর মধ্য দিয়ে নিউইয়র্কের ইতিহাসে প্রথম মুসলিম মেয়র হিসেবে দায়িত্ব নিলেন মামদানি—এবং কোরআন হাতে শপথ নেওয়া প্রথম মেয়রও হলেন তিনি।
জনতার উদ্দেশে দৃপ্ত বার্তা
শপথ গ্রহণের পর উপস্থিত বিপুল জনতার উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে মামদানি বলেন, ‘এমন মুহূর্ত খুব কমই আসে, যখন পরিবর্তন ও পুনর্গঠনের চাবিকাঠি জনগণের হাতেই থাকে।’ তিনি আরও বলেন, নির্বাচনে জয়ী হয়েছেন একজন গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রী হিসেবে এবং সেই পরিচয়েই তিনি শাসন পরিচালনা করবেন।
ভাষণে মামদানি জানান, তাঁকে প্রত্যাশা কমিয়ে রাখতে পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। তবে তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাঁর ভাষায়, ‘আমরা সব সময় সফল নাও হতে পারি, কিন্তু সাহসের অভাবের কথা যেন কেউ বলতে না পারে—সেটাই আমি নিশ্চিত করতে চাই।’
বিনা মূল্যে বাসসেবা, শিশু পরিচর্যা ও বাড়িভাড়া কমানোর মতো নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিগুলো মামদানির জনপ্রিয়তার বড় কারণ। অভিষেক অনুষ্ঠানে হাজার হাজার মানুষের উপস্থিতিই সেই আস্থার প্রতিফলন।
‘ব্লক পার্টি’ ও বাংলাদেশিদের প্রত্যাশা
প্রথমবারের মতো অভিষেক ঘিরে ‘ব্লক পার্টি’র আয়োজন করা হয়। মারে স্ট্রিট থেকে লিবার্টি স্ট্রিট পর্যন্ত সাতটি ব্লকে ছড়িয়ে পড়ে মানুষের ঢল। চার হাজার নিবন্ধিত অতিথি ছিলেন সিটি হল এলাকায়, বাকিরা আশপাশের ব্লকগুলোতে অবস্থান নেন।
বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত নিউইয়র্কবাসী পিউ বনিক বলেন, ‘মাইনাস ১০ ডিগ্রি তাপমাত্রা উপেক্ষা করে প্রায় ৫০ হাজার মানুষ এই ঐতিহাসিক অভিষেক দেখতে এসেছেন। আমরা আশা করছি, নতুন মেয়র বাংলাদেশিসহ সব সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের জন্য কাজ করবেন।’
দুই ধাপে শপথ ও রাজনৈতিক সমর্থন
মামদানির শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয় দুই ধাপে। ৩১ ডিসেম্বর মধ্যরাতে পরিত্যক্ত ওল্ড সিটি হল সাবওয়ে স্টেশনে প্রথম শপথ নেন তিনি। সেখানে তাঁকে শপথ পাঠ করান নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের অ্যাটর্নি জেনারেল লেটিসিয়া জেমস। উপস্থিত ছিলেন তাঁর বাবা অধ্যাপক মাহমুদ মামদানি, মা চলচ্চিত্রকার মীরা নায়ার এবং স্ত্রী রমা দুওয়াজি।
দ্বিতীয় ধাপে সিটি হলের সামনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তাঁকে পরিচয় করিয়ে দেন কংগ্রেসওম্যান আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও-কর্টেজ। পরে শপথ পাঠ করান সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স, যাঁকে নিজের রাজনৈতিক পথপ্রদর্শক হিসেবে মানেন মামদানি।
প্রথম দিনেই বড় সিদ্ধান্ত
অভিষেকের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই কার্যক্রম শুরু করেন মামদানি। প্রথম দিনেই তিনি সাবেক মেয়র এরিক অ্যাডামসের ২০২৪ সালের ২৬ সেপ্টেম্বরের পর জারি করা সব নির্বাহী আদেশ বাতিল করেন। এর মধ্যে ছিল মেয়র কার্যালয়ের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের ইসরায়েল বর্জন বা দেশটিতে বিনিয়োগ প্রত্যাহারে বিরত থাকার নির্দেশনাও।
চ্যালেঞ্জ কম নয়
মামদানির সামনে রয়েছে বড় চ্যালেঞ্জ। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে তাঁকে প্রায় ১০ লাখ বাসাবাড়িতে বিনা মূল্যে বিভিন্ন সেবা দিতে হবে, যার জন্য প্রয়োজন আনুমানিক এক হাজার কোটি ডলার। এ অর্থ জোগাড়ে উচ্চবিত্তদের ওপর কর বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি, যা বাস্তবায়নে গভর্নর ক্যাথি হোকুলের সমর্থন প্রয়োজন হবে।
এ ছাড়া সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গেও রাজনৈতিক সমীকরণ সামলাতে হবে তাঁকে। ট্রাম্প ইতোমধ্যে মামদানিকে ‘কমিউনিস্ট’ আখ্যা দিয়ে কেন্দ্রীয় তহবিল কমানোর হুমকি দিয়েছেন। তবে সাম্প্রতিক এক বৈঠকে ট্রাম্প মামদানির প্রতি সহযোগিতার আশ্বাসও দিয়েছেন।
সব মিলিয়ে, সাহসী সিদ্ধান্ত ও উচ্চাভিলাষী প্রতিশ্রুতি নিয়ে নিউইয়র্কের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করলেন জোহরান মামদানি।
দ্য গার্ডিয়ান অবলম্বনে