তুরস্কের পূর্বাঞ্চলীয় আগরি প্রদেশের দোগুবায়াজিত এলাকায় ধর্মীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ ‘নূহের নৌকা’র সন্ধানে নতুন করে বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান চালানো হচ্ছে। নৌকার আকৃতির ‘দুরুপিনার ফরমেশন’ নামে পরিচিত ভূতাত্ত্বিক কাঠামোটি ঘিরে কয়েক দশকের রহস্যের মধ্যে এবার ভূগর্ভস্থ কাঠামো শনাক্ত করতে রাডার স্ক্যান, মাটির নমুনা সংগ্রহ ও কোর ড্রিলিং করা হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত এটিকে নূহের নৌকার ধ্বংসাবশেষ বলে নিশ্চিত করার […]
ছবি: সংগৃহীত
তুরস্কের পূর্বাঞ্চলীয় আগরি প্রদেশের দোগুবায়াজিত এলাকায় ধর্মীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ ‘নূহের নৌকা’র সন্ধানে নতুন করে বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান চালানো হচ্ছে। নৌকার আকৃতির ‘দুরুপিনার ফরমেশন’ নামে পরিচিত ভূতাত্ত্বিক কাঠামোটি ঘিরে কয়েক দশকের রহস্যের মধ্যে এবার ভূগর্ভস্থ কাঠামো শনাক্ত করতে রাডার স্ক্যান, মাটির নমুনা সংগ্রহ ও কোর ড্রিলিং করা হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত এটিকে নূহের নৌকার ধ্বংসাবশেষ বলে নিশ্চিত করার মতো কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
সিভাস জুমহুরিয়েত বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক জানকার আতিলার নেতৃত্বে এই গবেষণা চলছে। মার্কিন গবেষক অ্যান্ড্রু জোন্সও এতে যুক্ত রয়েছেন। গবেষণার বিভিন্ন ধাপ ধারণ করতে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের কয়েকটি তথ্যচিত্র নির্মাতা দলও এলাকায় কাজ করছে। এর মধ্যে অভিযাত্রী ও টেলিভিশন উপস্থাপক বেয়ার গ্রিলসের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি দল রয়েছে।
গবেষকেরা প্রথমে দুরুপিনার ফরমেশনের বিভিন্ন পয়েন্টের জিপিএস অবস্থান নির্ধারণ করেন। এরপর দ্বিমাত্রিক ও ত্রিমাত্রিক মানচিত্র তৈরি করে ভূগর্ভস্থ কাঠামো শনাক্ত করতে বিশেষায়িত গ্রাউন্ড-পেনিট্রেটিং রাডার ব্যবহার করা হয়। রাডারে মাটির নিচে কয়েকটি অস্বাভাবিক অংশ ও ফাঁকা জায়গার ইঙ্গিত পাওয়ার পর সেসব এলাকায় কোর ড্রিলিং ও মাটির নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে।
গবেষক অ্যান্ড্রু জোন্স জানিয়েছেন, রাডার জরিপে কিছু জায়গায় সম্ভাব্য করিডর, কক্ষের মতো কাঠামো এবং ভূগর্ভস্থ শূন্যস্থান শনাক্ত হয়েছে। তবে এগুলো প্রাকৃতিকভাবে তৈরি হয়েছে, নাকি মানুষের তৈরি কোনো কাঠামোর অংশ—তা এখনো নিশ্চিত নয়। চলমান পরীক্ষার ফল পাওয়ার পর এ বিষয়ে আরও পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যাবে।
চলতি গবেষণায় প্রায় ১ হাজার মাটির নমুনা সংগ্রহ করে বিভিন্ন পরীক্ষাগারে পাঠানো হয়েছে। গবেষকেরা বিশেষ করে ভূগর্ভের কালচে ও বেশি জৈব পদার্থযুক্ত মাটির বৈশিষ্ট্য পরীক্ষা করছেন। প্রাথমিক বিশ্লেষণে ফরমেশনের ভেতরের মাটিতে আশপাশের মাটির তুলনায় প্রায় তিন গুণ বেশি জৈব পদার্থ পাওয়া গেছে বলে গবেষণা দলের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। তবে এসব ফলাফলকেও নূহের নৌকার অস্তিত্বের চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে ধরা হচ্ছে না।
দুরুপিনার ফরমেশনটি তেলচেকার গ্রামের কাছে, আরারাত পর্বতের আশপাশে অবস্থিত। ১৯৫৯ সালে তুরস্কের সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন ও মানচিত্রবিদ ইলহান দুরুপিনার আকাশ থেকে তোলা ছবি বিশ্লেষণের সময় অস্বাভাবিক আকৃতির এই ভূতাত্ত্বিক কাঠামো শনাক্ত করেন। এরপর থেকেই এটি নূহের নৌকার সম্ভাব্য অবস্থান হিসেবে আলোচনায় আসে।
বছরের পর বছর ধরে সেখানে বিভিন্ন ধরনের জরিপ ও অনুসন্ধান চালানো হয়েছে। তবে নূহের নৌকার ধ্বংসাবশেষ হিসেবে নিশ্চিতভাবে শনাক্ত করার মতো কাঠ, পেরেক বা অন্য কোনো মানবনির্মিত নিদর্শন এখনো পাওয়া যায়নি। তুরস্কের আনাদোলু এজেন্সির সাম্প্রতিক তথ্য যাচাই প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে, বর্তমান গবেষণা দল এখনো নৌকাটি পাওয়া গেছে—এমন কোনো চূড়ান্ত দাবি করেনি।
গবেষকদের মতে, দুরুপিনার ফরমেশনটি প্রাকৃতিক ভূতাত্ত্বিক কাঠামোও হতে পারে। অন্যদিকে নূহের নৌকার তত্ত্বের সমর্থকেরা ভূগর্ভস্থ অস্বাভাবিক কাঠামো ও মাটির বৈশিষ্ট্যকে আরও অনুসন্ধানের কারণ হিসেবে দেখছেন। তাই বর্তমান গবেষণার মূল লক্ষ্য হলো বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার মাধ্যমে কাঠামোটির প্রকৃতি নির্ধারণ করা।
গবেষণা দল জানিয়েছে, সংগৃহীত মাটির নমুনা ও অন্যান্য তথ্য নিয়ে আরও পরীক্ষা চলবে। চূড়ান্ত ফলাফল পাওয়ার পর এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হবে। গবেষকেরা আগামী বছরও অনুসন্ধান চালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছেন।
ইহুদি, খ্রিষ্টান ও মুসলিম ধর্মীয় ঐতিহ্যে নূহের নৌকার কাহিনি গুরুত্বপূর্ণ। ফলে দুরুপিনার ফরমেশনটি সত্যিই নূহের নৌকার সঙ্গে সম্পর্কিত কি না, তা নির্ধারণের চেষ্টা দীর্ঘদিন ধরেই গবেষক ও অনুসন্ধানকারীদের আগ্রহের বিষয়। তবে বর্তমান পর্যায়ে এটিকে নূহের নৌকার ধ্বংসাবশেষ হিসেবে দাবি করার মতো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি।