যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সাম্প্রতিক সমঝোতা মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে নতুন সমীকরণের জন্ম দিয়েছে। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর এই প্রথম কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট ও ইরানের প্রেসিডেন্টের মধ্যে আনুষ্ঠানিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ায় ঘটনাটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি করেছে। সমর্থকরা একে ঐতিহাসিক অগ্রগতি হিসেবে দেখলেও ইসরায়েল ও কয়েকটি উপসাগরীয় আরব দেশের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। বুধবার (১৭ জুন) […]
ছবি: সংগৃহীত
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সাম্প্রতিক সমঝোতা মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে নতুন সমীকরণের জন্ম দিয়েছে। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর এই প্রথম কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট ও ইরানের প্রেসিডেন্টের মধ্যে আনুষ্ঠানিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ায় ঘটনাটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি করেছে। সমর্থকরা একে ঐতিহাসিক অগ্রগতি হিসেবে দেখলেও ইসরায়েল ও কয়েকটি উপসাগরীয় আরব দেশের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।
বুধবার (১৭ জুন) ফ্রান্সের ভার্সাইয়ে অনুষ্ঠিত জি-৭ সম্মেলনের ফাঁকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান অন্তর্বর্তীকালীন সমঝোতা চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। এর মাধ্যমে কয়েক মাস ধরে চলা উত্তেজনা ও সংঘাতের অবসানের পথ তৈরি হয়েছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৪ দফার এই সমঝোতায় ৬০ দিনের জন্য যুদ্ধবিরতি কার্যকর রাখা এবং স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে সম্মতি হয়েছে। আলোচনার এজেন্ডায় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও আন্তর্জাতিক চাপের মুখে থাকা ইরানের জন্য এই চুক্তি বড় ধরনের কূটনৈতিক সাফল্য। এতে দেশটি অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং বৈশ্বিক স্বীকৃতি বৃদ্ধির সুযোগ পেতে পারে।
লেবাননের রাজনৈতিক বিশ্লেষক সারকিস নাওম বলেন, ওয়াশিংটন ও তেহরান উভয় পক্ষই এই সমঝোতা থেকে লাভবান হওয়ার সম্ভাবনা দেখছে। ইরান অর্থনৈতিক চাপ কমাতে আগ্রহী, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রও নতুন সামরিক সংঘাতে জড়াতে চায় না।
তবে ইসরায়েলে এই চুক্তিকে ভিন্নভাবে দেখা হচ্ছে। দেশটির জাতীয় নিরাপত্তা গবেষণা প্রতিষ্ঠানের জ্যেষ্ঠ গবেষক ড্যানি সিট্রিনোভিচ মন্তব্য করেছেন, এই সমঝোতা ইসরায়েলের জন্য কৌশলগত ধাক্কা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তার মতে, ইরানের ওপর কঠোর চাপ সৃষ্টি করে দেশটির আঞ্চলিক প্রভাব কমানোর যে লক্ষ্য ছিল, তা বাস্তবায়িত হয়নি।
তিনি বলেন, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি কিংবা আঞ্চলিক মিত্রদের কার্যক্রমের ওপর কোনো সুস্পষ্ট সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হয়নি। একইভাবে পারমাণবিক অবকাঠামো ধ্বংসের বিষয়ে স্পষ্ট কোনো রূপরেখাও চুক্তিতে নেই।
বিশ্লেষকদের ধারণা, চুক্তি বাস্তবায়িত হলে ইরান ধীরে ধীরে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিলের সুবিধা পাবে এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে সক্ষম হবে। এর ফলে দেশটির রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রভাবও বাড়তে পারে।
লেবাননেও এর প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। তেহরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহ ভবিষ্যতে আরও শক্তিশালী অবস্থানে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। যদিও লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন স্পষ্ট করেছেন যে, লেবাননের পক্ষ হয়ে কোনো বিদেশি শক্তি আলোচনা করবে না।
উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যেও এই সমঝোতা নিয়ে অস্বস্তি দেখা দিয়েছে। তাদের আশঙ্কা, ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব বৃদ্ধি পেলে মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা কাঠামোতে পরিবর্তন আসতে পারে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা নীতির ওপর তাদের নির্ভরতা নিয়েও নতুন প্রশ্ন তৈরি হতে পারে।
তবে ওয়াশিংটনভিত্তিক মধ্যপ্রাচ্য ইনস্টিটিউটের গবেষক অ্যালেক্স ভাতানকা মনে করেন, দীর্ঘদিনের চাপ প্রয়োগের কৌশল কাঙ্ক্ষিত ফল দেয়নি। তার মতে, বৃহত্তর যুদ্ধ এড়াতে এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে আলোচনাই সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ।
বিশ্লেষকরা বলছেন, চুক্তির প্রকৃত সফলতা নির্ভর করবে এর বাস্তবায়ন, ভবিষ্যৎ পারমাণবিক আলোচনা এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর প্রতিক্রিয়ার ওপর। বিশেষ করে ইসরায়েলের অবস্থান এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি আগামী দিনগুলোতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
একজন ইরানি কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দাবি করেছেন, সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে ইরান তার কৌশলগত লক্ষ্য অর্জনে সক্ষম হয়েছে এবং আঞ্চলিক মিত্রদের অবস্থান দুর্বল না করেই আলোচনার টেবিলে বসতে পেরেছে।
মধ্যপ্রাচ্যের নতুন এই সমীকরণ কতটা টেকসই হবে এবং এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব কী হবে, তা এখন সময়ই বলে দেবে।