যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তম আবাসন বাজারগুলোর অন্যতম নিউইয়র্ক সিটিতে ২০২৫ সালে বাড়ি বিক্রি করে অনেক মালিক উল্লেখযোগ্য মুনাফা অর্জন করলেও শহরের সব এলাকায় পরিস্থিতি একই ছিল না। নতুন এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, নিউইয়র্কের পাঁচটি বরোর মধ্যে একমাত্র ম্যানহাটনেই বাড়ি বিক্রি করে গড়ে লোকসানের মুখে পড়েছেন মালিকরা। অন্যদিকে ব্রুকলিন, স্ট্যাটেন আইল্যান্ড, কুইন্স এবং ব্রঙ্কসে অধিকাংশ বিক্রেতাই লাভের মুখ […]
ছবি: সংগৃহীত
যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তম আবাসন বাজারগুলোর অন্যতম নিউইয়র্ক সিটিতে ২০২৫ সালে বাড়ি বিক্রি করে অনেক মালিক উল্লেখযোগ্য মুনাফা অর্জন করলেও শহরের সব এলাকায় পরিস্থিতি একই ছিল না। নতুন এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, নিউইয়র্কের পাঁচটি বরোর মধ্যে একমাত্র ম্যানহাটনেই বাড়ি বিক্রি করে গড়ে লোকসানের মুখে পড়েছেন মালিকরা। অন্যদিকে ব্রুকলিন, স্ট্যাটেন আইল্যান্ড, কুইন্স এবং ব্রঙ্কসে অধিকাংশ বিক্রেতাই লাভের মুখ দেখেছেন।
রিয়েল এস্টেট তথ্য বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান PropertyShark-এর প্রকাশিত প্রতিবেদনের তথ্য তুলে ধরে নিউইয়র্ক পোস্ট জানায়, ২০২৫ সালে নিউইয়র্ক সিটিতে বিক্রি হওয়া প্রায় ১৫ হাজার আবাসিক সম্পত্তির তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। ২০০৫ সাল থেকে এসব সম্পত্তির ক্রয়মূল্যের সঙ্গে সর্বশেষ বিক্রয়মূল্য তুলনা করে কর ও বিভিন্ন ফি বাদ দিয়ে প্রকৃত লাভ-লোকসানের হিসাব করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, নিউইয়র্ক সিটিতে গত বছর বাড়ি বিক্রি করা মালিকরা গড়ে ৭০ হাজার ডলার নিট মুনাফা অর্জন করলেও ম্যানহাটনের চিত্র ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। সেখানে বাড়ি বিক্রি করে গড়ে ২৪ হাজার ডলার লোকসান হয়েছে।
অন্য চার বরোর চিত্র ছিল অনেক বেশি ইতিবাচক। স্ট্যাটেন আইল্যান্ডে বাড়ি বিক্রি করে গড়ে ১ লাখ ৬৪ হাজার ডলার লাভ হয়েছে, যা পুরো শহরের মধ্যে সর্বোচ্চ। এরপরেই রয়েছে ব্রুকলিন, যেখানে গড় লাভের পরিমাণ ১ লাখ ৫৯ হাজার ডলার। কুইন্সে গড়ে ৯৫ হাজার ডলার এবং ব্রঙ্কসে ৯৮ হাজার ডলার লাভ করেছেন বিক্রেতারা।
PropertyShark-এর বিশ্লেষক এলিজা থাইসের মতে, ম্যানহাটনের বর্তমান পরিস্থিতির মূল কারণ এক দশকেরও বেশি আগে শুরু হওয়া অতিবিলাসবহুল আবাসন নির্মাণের প্রবণতা।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, ২০১৩ সালের দিকে বিলিয়নিয়ার্স রো এবং লোয়ার ম্যানহাটন এলাকায় একের পর এক বিলাসবহুল কন্ডোমিনিয়াম নির্মিত হয়। সে সময় এসব আবাসনের মূল্য দ্রুত বৃদ্ধি পেলেও বর্তমান পুনর্বিক্রয় বাজার সেই দামকে আর সমর্থন করছে না। ফলে যারা সেই সময় উচ্চমূল্যে ফ্ল্যাট কিনেছিলেন, তাদের অনেকেই এখন লোকসানে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে ম্যানহাটনে বিক্রি হওয়া কন্ডোমিনিয়ামের ৫৯ শতাংশ এবং কো-অপ অ্যাপার্টমেন্টের ৫৪ শতাংশই লোকসানে বিক্রি হয়েছে। বিশেষ করে ফিন্যান্সিয়াল ডিস্ট্রিক্ট এলাকায় গড় লোকসান ছিল ১ লাখ ১৩ হাজার ডলার, আর সেন্ট্রাল পার্ক সাউথ এলাকায় গড় ক্ষতির পরিমাণ ছিল প্রায় ৯২ হাজার ডলার।
তবে ম্যানহাটনের সব ধরনের সম্পত্তির অবস্থা এক রকম নয়। একক পারিবারিক বাড়ি এবং দুই থেকে তিন পরিবারের বসবাসযোগ্য বাড়িগুলো এখনো উল্লেখযোগ্য মুনাফা দিচ্ছে। গত বছর এসব একক বাড়ি বিক্রি করে গড়ে ৭ লাখ ৩৯ হাজার ডলার লাভ হয়েছে। যদিও এ ধরনের সম্পত্তির সংখ্যা খুবই সীমিত এবং মোট লেনদেনের তুলনায় এর অংশ কম।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, কখন সম্পত্তি কেনা হয়েছে সেটিও লাভ-লোকসানের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
যারা ২০০৯ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে, অর্থাৎ বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের পরের সময়ে তুলনামূলক কম দামে বাড়ি কিনেছিলেন, তারা ২০২৫ সালে বিক্রি করে গড়ে ২ লাখ ৬ হাজার ডলার লাভ করেছেন। ওই সময় বাজার নিম্নমুখী থাকায় অনেকেই কম দামে সম্পত্তি কিনতে পেরেছিলেন এবং পরবর্তী বছরগুলোতে সুদের হারও ছিল তুলনামূলক কম।
অন্যদিকে, করোনা মহামারির সময় অর্থাৎ ২০২০ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে যারা উচ্চমূল্যে বাড়ি কিনেছিলেন, তারা বিক্রি করে গড়ে মাত্র ৯ হাজার ডলার লাভ করতে পেরেছেন।
বিশেষ করে ম্যানহাটনের অ্যাপার্টমেন্ট বাজারে পরিস্থিতি আরও কঠিন। ২০১৩ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে যারা সেখানে অ্যাপার্টমেন্ট কিনেছিলেন, তারা গত বছর বিক্রি করে গড়ে ৭১ হাজার ডলার লোকসান করেছেন। এমনকি মহামারির সময় বাড়ি কেনা ক্রেতাদের তুলনায়ও এই লোকসানের পরিমাণ বেশি।
প্রতিবেদনে আরও দেখা গেছে, শহরের ২৫টি এলাকায় যেখানে পুনরায় বিক্রিতে গড় লোকসান হয়েছে, তার মধ্যে ২৩টিই ম্যানহাটনে অবস্থিত। বাকি দুটি হলো ব্রুকলিনের ডাম্বো এবং কুইন্সের গ্লেন ওকস, যেখানে কন্ডোমিনিয়াম ও কো-অপ আবাসনের আধিক্য রয়েছে।
অন্যদিকে ব্রুকলিনের দুই থেকে তিন পরিবারের জন্য নির্মিত বাড়িগুলো সবচেয়ে বেশি লাভজনক সম্পত্তি হিসেবে উঠে এসেছে। এসব বাড়ি বিক্রি করে গড়ে ৪ লাখ ৩৯ হাজার ডলার লাভ হয়েছে। শহরের মধ্যে বরো পার্ক এলাকায় গড় লাভ ছিল ৪ লাখ ৯ হাজার ডলার, কুইন্সের ফ্রেশ মেডোজে ৩ লাখ ৭০ হাজার ডলার এবং ব্রুকলিনের ওশান হিলে ৩ লাখ ৬৬ হাজার ডলার।
বিশ্লেষকদের মতে, গত দুই দশকে ব্রুকলিন ও স্ট্যাটেন আইল্যান্ডে বার্ষিক গড় মূল্যবৃদ্ধি ছিল প্রায় ৪ শতাংশ, যা অন্য বরোগুলোর তুলনায় বেশি। এছাড়া স্ট্যাটেন আইল্যান্ডে নতুন বিলাসবহুল আবাসন প্রকল্প তুলনামূলক কম হওয়ায় সেখানে অতিমূল্যায়নের ঝুঁকিও কম ছিল। ফলে সাম্প্রতিক বছরগুলোতেও ওই বরোর বাড়ির মালিকরা ভালো মুনাফা ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছেন।
প্রতিবেদনটি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, নিউইয়র্কের আবাসন বাজার এখনো শক্তিশালী অবস্থানে থাকলেও সব এলাকায় সমান সুযোগ নেই। বিশেষ করে ম্যানহাটনের বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্ট খাতে অতীতের উচ্চমূল্যের প্রভাব এখনো বাজারে রয়ে গেছে। তাই বিশেষজ্ঞদের মতে, সম্পত্তি কেনা বা বিক্রির আগে শুধু বর্তমান বাজারদর নয়, বরং এলাকার দীর্ঘমেয়াদি মূল্যপ্রবণতা এবং সম্পত্তির ধরনও বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।