যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক সিটির পাবলিক স্কুল ব্যবস্থায় এক শিক্ষার্থীর পেছনে বছরে গড়ে প্রায় ৩৬ হাজার ডলার ব্যয় করা হয়। জাতীয় গড়ের তুলনায় এই ব্যয় দ্বিগুণেরও বেশি হলেও শহরের বহু স্কুলে শিক্ষার্থীদের ফলাফল হতাশাজনক থেকে যাচ্ছে। গণিত ও ইংরেজি রিডিংয়ের মতো মৌলিক দক্ষতা যাচাইয়ের মানদণ্ড পরীক্ষায় শহরের প্রায় অর্ধেক পাবলিক স্কুলের অধিকাংশ শিক্ষার্থীই পাস করতে পারছে না—এমন […]
ছবি: সংগৃহীত
যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক সিটির পাবলিক স্কুল ব্যবস্থায় এক শিক্ষার্থীর পেছনে বছরে গড়ে প্রায় ৩৬ হাজার ডলার ব্যয় করা হয়। জাতীয় গড়ের তুলনায় এই ব্যয় দ্বিগুণেরও বেশি হলেও শহরের বহু স্কুলে শিক্ষার্থীদের ফলাফল হতাশাজনক থেকে যাচ্ছে। গণিত ও ইংরেজি রিডিংয়ের মতো মৌলিক দক্ষতা যাচাইয়ের মানদণ্ড পরীক্ষায় শহরের প্রায় অর্ধেক পাবলিক স্কুলের অধিকাংশ শিক্ষার্থীই পাস করতে পারছে না—এমন চিত্রই উঠে এসেছে নতুন এক প্রতিবেদনে।
‘সাকসেস একাডেমি’ চার্টার স্কুল নেটওয়ার্ক প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে নিউইয়র্কের শিক্ষাব্যবস্থার গভীর সংকট তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিপুল অঙ্কের অর্থ ব্যয়ের পরও শহরের জনশিক্ষা ব্যবস্থার বড় একটি অংশ কার্যত মানসম্মত ফল দিতে ব্যর্থ হচ্ছে। নেটওয়ার্কটির দাবি, এই ব্যর্থতা শুধু একটি বা দুটি স্কুলের সমস্যা নয়; বরং এটি পুরো ব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতার প্রতিফলন।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৪ লাখ ৯ হাজার ৩৭৯ জন পাবলিক স্কুল শিক্ষার্থী—যা শহরের মোট পাবলিক স্কুল শিক্ষার্থীর প্রায় ৪৩ শতাংশ—এমন স্কুলে পড়ছে, যেগুলোকে পুরোপুরি ব্যর্থ বা মানহীন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব স্কুলে শিশুদের মৌলিক গণিত ও ইংরেজি রিডিং দক্ষতা অর্জনের হার আশঙ্কাজনকভাবে কম।
প্রতিবেদনের একটি অংশে ৫০৩টি এমন স্কুলের তালিকা দেওয়া হয়েছে, যেগুলোকে ‘ডাবল ফেইল’ বা দ্বিগুণ ব্যর্থ স্কুল হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ, এসব প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশ শিক্ষার্থী গণিত এবং ইংরেজি—দুই বিষয়েই মানদণ্ড পরীক্ষায় প্রয়োজনীয় সাফল্য অর্জন করতে পারেনি। আশ্চর্যের বিষয়, এসব স্কুলের নামের মধ্যে আব্রাহাম লিংকন, অ্যালবার্ট আইনস্টাইন, বেঞ্জামিন ফ্র্যাঙ্কলিন, ওয়াল্ট হুইটম্যানের মতো ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বদের নামও রয়েছে। কোথাও আবার ‘লিডারস অব টুমরো’ বা ‘ব্রুকলিন ডেমোক্রেসি একাডেমি’র মতো উচ্চাভিলাষী নাম ব্যবহার করা হয়েছে।
প্রতিবেদনটিতে শিক্ষাব্যবস্থার এই দুরবস্থাকে অন্য সরকারি সেবার সঙ্গে তুলনা করে বলা হয়েছে, কোনো হাসপাতালের অর্ধেকের বেশি রোগী যদি মৌলিক চিকিৎসায় সাড়া না পায় কিংবা কোনো দমকল বিভাগ যদি অর্ধেকের বেশি জরুরি ফোনে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়, তাহলে সেটিকে কখনোই স্বাভাবিক বলা যেত না। অথচ স্কুলব্যবস্থার ক্ষেত্রে এমন ব্যর্থতা বহু বছর ধরে চললেও তা নিয়ে যথেষ্ট জবাবদিহি হচ্ছে না।
সাকসেস একাডেমি চার্টার স্কুল নেটওয়ার্কের প্রধান নির্বাহী এবং নিউইয়র্ক সিটি কাউন্সিলের শিক্ষা কমিটির সাবেক চেয়ারপারসন ইভা মস্কোভিটস এই প্রতিবেদনকে শহরের শিক্ষাব্যবস্থার ব্যর্থতার সবচেয়ে পূর্ণাঙ্গ চিত্র বলে উল্লেখ করেছেন। তার মতে, বিপুল অর্থ ব্যয় করেও নিউইয়র্কের অনেক সরকারি স্কুল শিক্ষার্থীদের মৌলিক দক্ষতা অর্জনে সাহায্য করতে পারছে না।
প্রতিবেদনের এই সমালোচনামূলক অবস্থান নিউইয়র্কের বর্তমান মেয়র জোহরান মামদানি এবং স্কুল চ্যান্সেলর কামার স্যামুয়েলসের সাম্প্রতিক বক্তব্যের সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক বলে মন্তব্য করেছেন বিশ্লেষকরা। গত জুনে এক ভিডিও বার্তায় তারা নিউইয়র্কের পাবলিক স্কুল শিক্ষাব্যবস্থাকে সাফল্যের উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেছিলেন। কিন্তু নতুন এই পরিসংখ্যান সেই দাবিকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
সমালোচকদের মতে, নিউইয়র্কের শিক্ষা খাতে রেকর্ড ব্যয় হলেও ফলাফলে যে গতি নেই, তা শুধু অর্থ নয়, নীতিগত অগ্রাধিকার, প্রশাসনিক জবাবদিহি ও স্কুল পরিচালনার কার্যকারিতা নিয়েও বড় প্রশ্ন তুলছে। তাদের দাবি, যদি মৌলিক শিক্ষার ভিত্তিই দুর্বল থাকে, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সাফল্যও ঝুঁকির মুখে পড়বে।
প্রতিবেদনটি প্রকাশের পর নিউইয়র্কের শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে আবারও নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। অভিভাবক, শিক্ষাবিদ ও নীতিনির্ধারকদের বড় অংশই এখন জানতে চাইছেন, এত বিপুল ব্যয়ের পরও কেন শিক্ষার্থীরা প্রয়োজনীয় মান অর্জন করতে পারছে না—এবং এই সংকট থেকে বেরিয়ে আসার কার্যকর পথই বা কী।
সূত্র: সাকসেস একাডেমি চার্টার স্কুল নেটওয়ার্ক