নিউইয়র্কের ব্রুকলিনে বাড়ির মালিকানা জালিয়াতি বা ডিড থেফট এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো অপরাধ হিসেবে দেখা যাচ্ছে না। এটি ধীরে ধীরে শহরের জন্য এক গভীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকটে রূপ নিয়েছে। এর প্রভাব পড়ছে হাজারো পরিবারের জীবনে, বিশেষ করে যারা নিজেদের দীর্ঘদিনের সম্পত্তি সুরক্ষায় যথেষ্ট সজাগ থাকতে পারছেন না। গত এক দশকে নিউইয়র্ক সিটিতে এ ধরনের […]
ছবি: সংগৃহীত
নিউইয়র্কের ব্রুকলিনে বাড়ির মালিকানা জালিয়াতি বা ডিড থেফট এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো অপরাধ হিসেবে দেখা যাচ্ছে না। এটি ধীরে ধীরে শহরের জন্য এক গভীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকটে রূপ নিয়েছে। এর প্রভাব পড়ছে হাজারো পরিবারের জীবনে, বিশেষ করে যারা নিজেদের দীর্ঘদিনের সম্পত্তি সুরক্ষায় যথেষ্ট সজাগ থাকতে পারছেন না। গত এক দশকে নিউইয়র্ক সিটিতে এ ধরনের বিপুল অভিযোগ জমা পড়েছে, যার বড় অংশ ব্রুকলিন ও কুইন্সকেন্দ্রিক।
পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৩ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে সাড়ে তিন হাজারেরও বেশি অভিযোগ নথিভুক্ত হয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এ প্রবণতা আরও দ্রুত বেড়েছে। ২০২৩ সালে যেখানে অভিযোগ ছিল প্রায় ১৪৯টি, সেখানে ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৫১৭-এ। অর্থাৎ মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে অভিযোগের সংখ্যা কয়েক গুণ বেড়ে যায়, যা শহরের আবাসন নিরাপত্তা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলেছে। ২০২৫ সালেই পাঁচ শতাধিক নতুন অভিযোগ জমা পড়ে, যা সমস্যাটির বিস্তার কতটা ভয়াবহ হয়ে উঠেছে, তা স্পষ্ট করে।
এই ধরনের জালিয়াতিতে প্রতারকেরা সাধারণত জাল স্বাক্ষর, ভুয়া কাগজপত্র এবং আইনি ফাঁকফোকর ব্যবহার করে কোনো সম্পত্তির মালিকানা আসল মালিকের অজান্তেই নিজেদের নামে স্থানান্তর করে নেয়। অনেক সময় বয়স্ক, অসুস্থ কিংবা আর্থিকভাবে দুর্বল মানুষদের টার্গেট করা হয়। তাদের কাছ থেকে নানা কৌশলে কাগজে সই নেওয়া হয়, আর পরে দেখা যায় তারা নিজের বাড়ির মালিকানাই হারিয়ে ফেলেছেন। কেউ কেউ তখন জানতে পারেন যে তাদের বাড়ি ইতিমধ্যে ভাড়া দেওয়া হয়েছে, বিক্রি হয়ে গেছে কিংবা ওই সম্পত্তির নামে ঋণ তোলা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এর পেছনে একক কোনো ব্যক্তি নয়, বরং সুসংগঠিত একটি চক্র কাজ করছে। ভুয়া কোম্পানি, রিয়েল এস্টেট ব্রোকার এবং কিছু অসাধু পেশাজীবীর যোগসাজশের অভিযোগও উঠেছে। তদন্তে দেখা গেছে, পরিকল্পিতভাবে একাধিক সম্পত্তিকে টার্গেট করে দীর্ঘমেয়াদি প্রতারণা চালানো হচ্ছে। ফলে একেকটি বাড়ি শুধু আর্থিক সম্পদ হিসেবেই নয়, পুরো পরিবারের নিরাপত্তা, স্থিতি ও ভবিষ্যৎকেও ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন বয়স্ক বাড়ির মালিক, কৃষ্ণাঙ্গ ও লাতিনো সম্প্রদায়ের পরিবার এবং এমন পরিবার, যারা বহু বছর আগে তুলনামূলক কম দামে বাড়ি কিনেছিলেন। পরে জেন্ট্রিফিকেশনের কারণে এসব বাড়ির বাজারমূল্য বহুগুণ বেড়ে যাওয়ায় সেগুলো জালিয়াতদের কাছে আকর্ষণীয় লক্ষ্য হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে যেসব বাড়িতে উত্তরাধিকার নিয়ে জটিলতা আছে অথবা যেসব মালিক আর্থিক সংকটে আছেন, সেসব সম্পত্তি প্রতারণার শিকার হওয়ার ঝুঁকিতে বেশি।
আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রেও বড় সীমাবদ্ধতা রয়েছে। বিপুল অভিযোগ জমা পড়লেও খুব অল্পসংখ্যক মামলায় অপরাধীরা চূড়ান্তভাবে দোষী সাব্যস্ত হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে ৩০ জনেরও কম অভিযুক্তকে শাস্তি দেওয়া সম্ভব হয়েছে। ফলে জালিয়াত চক্রগুলো প্রায়ই পার পেয়ে যাচ্ছে এবং একই পদ্ধতিতে নতুন নতুন ভুক্তভোগীকে টার্গেট করছে।
ব্রুকলিনের বেডফোর্ড-স্টাইভেসান্ট, ক্রাউন হাইটস, ব্রাউনসভিল এবং ফ্ল্যাটবুশ এলাকায় সমস্যাটি সবচেয়ে বেশি প্রকট। বহু পরিবারই টের পাচ্ছে না, কখন তাদের সম্পত্তির মালিকানা অন্যের নামে চলে গেছে। এরপর শুরু হয় দীর্ঘ আইনি লড়াই, যা অনেক সময় বছর ধরে টেনে নিতে হয়। এই লড়াই চালিয়ে যাওয়ার মতো আর্থিক ও মানসিক সক্ষমতা অনেক ভুক্তভোগীর থাকে না।
এমন বাস্তবতায় নিউইয়র্ক সিটির মেয়র জোহরান মামদানি কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। তিনি বলেছেন, একটি বাড়ি চুরি হওয়া মানে একটি পরিবারের ভবিষ্যৎ চুরি হয়ে যাওয়া। তার এই মন্তব্যে বোঝা যায়, বিষয়টিকে শহর প্রশাসন এখন আর সাধারণ সম্পত্তি-বিরোধ হিসেবে দেখছে না; বরং একটি গুরুতর সামাজিক সংকট হিসেবে বিবেচনা করছে।
মেয়র জানান, জালিয়াতি শনাক্ত, তদন্ত জোরদার এবং ক্ষতিগ্রস্তদের আইনি সহায়তা দেওয়ার জন্য শহর প্রশাসন বিশেষ একটি ইউনিট গঠন করেছে। তার ভাষায়, প্রশাসন আর নীরব দর্শকের ভূমিকায় থাকবে না। বরং প্রতারণা প্রতিরোধে সক্রিয়ভাবে কাজ করবে, যাতে নিউইয়র্কের প্রতিটি বাসিন্দা নিজের বাড়িতে নিরাপদ থাকতে পারে।
এদিকে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাড়ির মালিকদের নিয়মিতভাবে সম্পত্তির রেকর্ড যাচাই করা জরুরি। কোনো সন্দেহজনক কাগজপত্রে সই না করা, মালিকানাসংক্রান্ত নথি সতর্কভাবে সংরক্ষণ করা এবং প্রয়োজন হলে আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া উচিত। কারণ বাড়ির মালিকানা জালিয়াতি শুধু একটি বাড়ি হারানোর বিষয় নয়; এটি একটি পরিবারের প্রজন্মের সম্পদ, আর্থিক নিরাপত্তা এবং সামাজিক ভিত্তিকে দুর্বল করে দেয়।
সাম্প্রতিক ব্রুকলিনে হওয়া বিক্ষোভ ও প্রতিবাদও দেখিয়ে দিয়েছে যে এই সংকট এখন অনেক বিস্তৃত আকার নিয়েছে। তাই আইনগত পদক্ষেপের পাশাপাশি সচেতনতা, নজরদারি এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত না হলে ভবিষ্যতে আরও বহু পরিবার তাদের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হারানোর ঝুঁকিতে পড়বে।