সম্পূর্ণ নিউজ বাংলা-ভয়েজ

আন্তর্জাতিক
২:০২ পিএম, ৩ জুলাই ২০২৬

নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও রাজনৈতিক বিভাজনের শঙ্কায় খামেনির শেষকৃত্য এড়িয়ে যাচ্ছেন অনেক ইরানি

ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির শেষকৃত্যকে কেন্দ্র করে রাজধানী তেহরানে নজিরবিহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে দেশটির কর্তৃপক্ষ। তবে রাষ্ট্রীয়ভাবে ব্যাপক আয়োজন ও কোটি মানুষের অংশগ্রহণের প্রত্যাশা থাকলেও অনেক সাধারণ ইরানি এই অনুষ্ঠানে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সরকারি সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লা কমপ্লেক্সে জনগণের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য খামেনির মরদেহ রাখা হবে। […]

নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও রাজনৈতিক বিভাজনের শঙ্কায় খামেনির শেষকৃত্য এড়িয়ে যাচ্ছেন অনেক ইরানি

ছবি: সংগৃহীত

নিজস্ব প্রতিবেদক
৩ মিনিটে পড়ুন |

ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির শেষকৃত্যকে কেন্দ্র করে রাজধানী তেহরানে নজিরবিহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে দেশটির কর্তৃপক্ষ। তবে রাষ্ট্রীয়ভাবে ব্যাপক আয়োজন ও কোটি মানুষের অংশগ্রহণের প্রত্যাশা থাকলেও অনেক সাধারণ ইরানি এই অনুষ্ঠানে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

সরকারি সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লা কমপ্লেক্সে জনগণের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য খামেনির মরদেহ রাখা হবে। পরবর্তীতে রাজধানীর প্রধান সড়কগুলোতে বড় পরিসরের শোকযাত্রা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। ইরানি কর্তৃপক্ষের ধারণা, এই শেষ বিদায়ে দেড় থেকে দুই কোটি মানুষ অংশ নিতে পারেন।

তবে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে উঠে এসেছে ভিন্ন চিত্র। তেহরানের বিভিন্ন এলাকায় স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় মানুষের উপস্থিতি কমে গেছে, অনেক দোকানপাট বন্ধ রয়েছে এবং রাজধানী ছেড়ে অন্য শহরে যাওয়ার পথে তৈরি হয়েছে দীর্ঘ যানজট।

অনেক বাসিন্দার মতে, বিপুল জনসমাগম, কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি এড়াতেই তারা শহর ছাড়ছেন।

গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ হামলায় খামেনির মৃত্যুর পর ইরানে দীর্ঘ শোক পালনের ঘোষণা দেওয়া হয়। পরবর্তীতে নিরাপত্তাজনিত পরিস্থিতির কারণে পূর্বনির্ধারিত বিদায় অনুষ্ঠান স্থগিত করা হয়েছিল। বর্তমানে যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও আঞ্চলিক উত্তেজনা পুরোপুরি কমেনি।

বিশ্লেষকদের মতে, খামেনির শেষকৃত্য শুধু একটি রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান নয়; এটি বর্তমান ইরানের রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতারও প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে।

দেশটির অনেক নাগরিক মনে করছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অর্থনৈতিক সংকট, মূল্যস্ফীতি ও রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে উঠেছে। এমন পরিস্থিতিতে বিপুল ব্যয়ে আয়োজিত রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান নিয়ে তাদের মধ্যে প্রশ্ন ও অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।

কিছু নাগরিকের অভিযোগ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা জরুরি মানবিক পরিস্থিতিতে সরকার যে ধরনের সহায়তা দিতে ব্যর্থ হয়, সেই সক্ষমতার প্রদর্শন এখন একটি রাষ্ট্রীয় শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে দেখা যাচ্ছে।

নিরাপত্তা ঝুঁকিও অনেকের উদ্বেগের বড় কারণ। বিশাল জনসমাগমের কারণে দুর্ঘটনা, পদদলিত হওয়ার আশঙ্কা কিংবা সম্ভাব্য সহিংসতার শঙ্কা প্রকাশ করেছেন অনেকে।

মাশহাদের এক বাসিন্দা বলেন, মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন, বড় ধরনের কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটলে সাধারণ মানুষই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

তেহরানের একজন অনুবাদক জানান, শহরের বহু পরিবার ইতোমধ্যে রাজধানী ছেড়ে চলে গেছে। তার ভাষায়, যে পরিমাণ মানুষের উপস্থিতির কথা বলা হচ্ছে, বাস্তবে সেই সংখ্যা নিয়ে অনেকের মধ্যেই সংশয় রয়েছে।

আরেকজন বাসিন্দার দাবি, বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সরকারি কর্মচারী ও শিক্ষার্থীদের তেহরানে আনার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে বলে আলোচনা চলছে। বিশেষ করে শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তিনি।

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় নতুন করে তল্লাশি চৌকি স্থাপন, সড়ক বন্ধ এবং বাড়তি নিরাপত্তা উপস্থিতিও সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় প্রভাব ফেলছে।

তথ্যপ্রযুক্তি খাতে কর্মরত এক বাসিন্দা বলেন, শহরের পরিবেশ এখন অত্যন্ত চাপা ও অস্বস্তিকর। তার মতে, নিরাপত্তা সদস্য এবং কট্টরপন্থী গোষ্ঠীর উপস্থিতি তেহরানের পরিবেশকে আরও ভারী করে তুলেছে।

অনুষ্ঠানের ব্যয় নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে। তাদের মতে, অর্থনৈতিক চাপ ও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির সময়ে এত বড় আয়োজনের যৌক্তিকতা নিয়ে জনমনে আলোচনা তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।

একজন ব্যবসায়ী বলেন, মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ছে, অথচ একই সময়ে রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে বিপুল অর্থ ব্যয়ের খবর জনগণের মধ্যে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি করছে।

তেহরানের এক শিল্পীর ভাষায়, দেশের সাধারণ মানুষের জীবন ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কেন্দ্রের বাস্তবতা অনেকটাই আলাদা হয়ে গেছে। ফলে এই ধরনের আয়োজন সমাজের একটি নির্দিষ্ট অংশের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হলেও সবার কাছে একই অর্থ বহন করে না।

অন্যদিকে, ইরান সরকার এই শেষকৃত্যকে জাতীয় ঐক্য ও রাষ্ট্রীয় মর্যাদার প্রতীক হিসেবে তুলে ধরছে। দেশটির শীর্ষ নেতারা জনগণকে ব্যাপকভাবে অংশগ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন।

ইরানি কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে প্রতিনিধি, ধর্মীয় নেতা এবং হাজারো সংবাদকর্মী এই আয়োজন পর্যবেক্ষণ করবেন।

এদিকে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি। সাম্প্রতিক হামলায় আহত হওয়ার পর থেকে তিনি জনসমক্ষে খুব কমই দেখা দিয়েছেন। ফলে শেষকৃত্যে তার উপস্থিতি কিংবা অনুপস্থিতি ইরানের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক নেতৃত্ব নিয়ে নতুন আলোচনা সৃষ্টি করতে পারে।

জানা গেছে, আগামী ৯ জুলাই উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মাশহাদ শহরে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে দাফন করা হবে।

Facebook Comments Box
Advertise with us
এ বিভাগের আরও খবর


Advertise with us
আরও বাংলা-ভয়েজ সংবাদ