নিউইয়র্ক সিটির মেয়র জোহরান মামদানি দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র ছয় মাসের মধ্যেই ডেমোক্রেটিক পার্টির অন্যতম প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। ৩৪ বছর বয়সী এই ডেমোক্রেটিক সমাজতান্ত্রিক নেতা এখন শুধু সিটি প্রশাসনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নন, বরং নিউইয়র্কের আসন্ন ডেমোক্রেটিক প্রাইমারি নির্বাচনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে শুরু করেছেন। নির্বাচনের মাত্র কয়েক দিন আগে তিনি দলের প্রচলিত নেতৃত্বের অবস্থান […]
ছবি: সংগৃহীত
নিউইয়র্ক সিটির মেয়র জোহরান মামদানি দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র ছয় মাসের মধ্যেই ডেমোক্রেটিক পার্টির অন্যতম প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। ৩৪ বছর বয়সী এই ডেমোক্রেটিক সমাজতান্ত্রিক নেতা এখন শুধু সিটি প্রশাসনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নন, বরং নিউইয়র্কের আসন্ন ডেমোক্রেটিক প্রাইমারি নির্বাচনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে শুরু করেছেন।
নির্বাচনের মাত্র কয়েক দিন আগে তিনি দলের প্রচলিত নেতৃত্বের অবস্থান থেকে সরে গিয়ে একাধিক প্রার্থীকে প্রকাশ্যে সমর্থন দিয়েছেন। তার এই পদক্ষেপকে অনেক বিশ্লেষক ডেমোক্রেটিক পার্টির ভবিষ্যৎ আদর্শিক দিকনির্দেশনা নিয়ে নতুন বিতর্কের সূচনা হিসেবে দেখছেন।
খুব বেশি দিন আগেও মামদানি ছিলেন রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু। ডেমোক্রেটিক ও রিপাবলিকান—উভয় দলের নেতাদের সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছিল তাকে। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বামপন্থী রাজনীতির সমর্থকদের মধ্যে তার জনপ্রিয়তা আরও বেড়েছে। এখন নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের রাজধানী অ্যালবানি থেকে শুরু করে ওয়াশিংটন পর্যন্ত ডেমোক্রেটিক রাজনীতিতে নতুন প্রজন্মের নেতৃত্ব গড়ে তোলার আলোচনায় তার নাম গুরুত্বের সঙ্গে উচ্চারিত হচ্ছে।
নিজের রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের অংশ হিসেবেই মামদানি এবার কয়েকজন প্রার্থীকে সমর্থন দিয়েছেন, যাদের অনেকেই দলীয় মূলধারার নেতৃত্বের পছন্দের তালিকায় নেই। বৃহস্পতিবার ব্রুকলিনে ভোটারদের উৎসাহিত করতে আয়োজিত এক সমাবেশে স্বতন্ত্র সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্সের সঙ্গে তার অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। ওই সমাবেশে মামদানির সমর্থিত একাধিক প্রার্থীও উপস্থিত থাকবেন।
বার্নি স্যান্ডার্সের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা এবং মামদানির ঘনিষ্ঠ সহযোগী ফয়েজ শাকির বলেন, “জোহরান মনে করেন ডেমোক্রেটিক পার্টিকে নতুনভাবে গড়ে তোলার একটি বাস্তব সুযোগ এসেছে। তিনি কারও সমালোচনা করার জন্য এই অবস্থান নিচ্ছেন না। তিনি বিশ্বাস করেন, যেসব প্রার্থীকে সমর্থন করছেন তারা আরও শক্তিশালী ও কার্যকর রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করছেন। প্রয়োজন হলে পরাজয়ের ঝুঁকি নিয়েও তিনি সেই অবস্থানে অটল থাকবেন।”
নিউইয়র্কের ১৩তম কংগ্রেসনাল জেলায় বর্তমান কংগ্রেসম্যান আদ্রিয়ানো এস্পাইয়াতের পরিবর্তে রাজনৈতিক সংগঠক দারিয়ালিজা আভিলা শেভালিয়েরকে সমর্থন দিয়েছেন মামদানি। এছাড়া ১০তম জেলায় বর্তমান কংগ্রেসম্যান ড্যান গোল্ডম্যানের বিরুদ্ধে সাবেক সিটি কম্পট্রোলার ব্র্যাড ল্যান্ডারকে সমর্থন জানিয়েছেন তিনি।
সপ্তম জেলায় ডেমোক্রেটিক সমাজতান্ত্রিক ধারার অ্যাসেম্বলি সদস্য ক্লেয়ার ভালদেজও মামদানির সমর্থন পেয়েছেন। তিনি বলেন, “গত বছরের মেয়র নির্বাচনে জোহরান মামদানি যেভাবে ভোটারদের উজ্জীবিত করেছিলেন, এখন সেই শক্তিকে আরও বিস্তৃত করার সময় এসেছে। আমরা চাই সেই রাজনৈতিক উদ্দীপনা এবার কংগ্রেসনাল নির্বাচনেও প্রতিফলিত হোক।”
তবে মামদানির এই রাজনৈতিক সক্রিয়তা দলীয় মূলধারার নেতাদের মধ্যে অস্বস্তি তৈরি করেছে। মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্রেটিক নেতা হাকিম জেফরিজ প্রকাশ্যে মামদানি-সমর্থিত সমাজতান্ত্রিক প্রার্থীদের বিরোধিতা করছেন এবং বর্তমান নির্বাচিত প্রতিনিধিদের পক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছেন।
মামদানির সমর্থিত প্রার্থীরা তাদের প্রচারণায় বিশেষভাবে গাজা যুদ্ধ, জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয় এবং সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক সংকটকে গুরুত্ব দিচ্ছেন। তাদের দাবি, ডেমোক্রেটিক পার্টির কিছু নেতা ইসরায়েলের প্রতি অতিমাত্রায় নমনীয় অবস্থান গ্রহণ করেছেন এবং করপোরেট স্বার্থের প্রভাব থেকে বেরিয়ে আসতে ব্যর্থ হয়েছেন।
তারা নিজেদের এমন একটি নতুন রাজনৈতিক প্রজন্ম হিসেবে তুলে ধরছেন, যারা বড় করপোরেট অনুদানের ওপর নির্ভর না করে সাধারণ ভোটারদের সমর্থনের ভিত্তিতে রাজনীতি করতে চায়।
ওয়াশিংটনের অনেক ডেমোক্রেটিক কৌশলবিদ মনে করছেন, মামদানি এখন দলের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সম্পদ। তাদের মতে, তিনি এমন অনেক তরুণ ও হতাশ ভোটারকে আবারও রাজনীতির মূলধারায় ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছেন, যারা দীর্ঘদিন রাজনৈতিক প্রক্রিয়া থেকে দূরে ছিলেন।
তবে মধ্যপন্থী ডেমোক্রেটদের একটি অংশ এই উত্থানকে ভিন্নভাবে দেখছে। তাদের আশঙ্কা, মামদানির বামঘেঁষা অবস্থান দলীয় ঐক্যের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে এবং নির্বাচনে বিভক্তির ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
অন্যদিকে রিপাবলিকান পার্টিও মামদানির জনপ্রিয়তাকে নিজেদের রাজনৈতিক প্রচারণার অংশ হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা করছে। ন্যাশনাল রিপাবলিকান কংগ্রেসনাল কমিটির মুখপাত্র মাইক মারিনেলা বলেন, “জোহরান মামদানির সমাজতান্ত্রিক রাজনীতি অত্যন্ত বিতর্কিত। তার উত্থান ডেমোক্রেটিক পার্টি কোন দিকে যাচ্ছে, সে বিষয়ে ভোটারদের সামনে একটি স্পষ্ট বার্তা তুলে ধরছে।”
তবে এসব সমালোচনাকে গুরুত্ব দিতে নারাজ ফয়েজ শাকির। তিনি বলেন, “অনেকে মামদানিকে রাজনৈতিক বোঝা হিসেবে দেখাতে চান, কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। তিনি ক্রমেই ডেমোক্রেটিক রাজনীতির একটি শক্তিশালী সম্পদে পরিণত হচ্ছেন। তার নেতৃত্ব নতুন প্রজন্মের ভোটারদের অনুপ্রাণিত করছে এবং দলকে নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করছে।”
আসন্ন প্রাইমারি নির্বাচনের ফলাফল যাই হোক না কেন, জোহরান মামদানির ক্রমবর্ধমান প্রভাব যে নিউইয়র্কের ডেমোক্রেটিক রাজনীতিতে নতুন এক বাস্তবতা তৈরি করেছে, তা নিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে খুব কমই দ্বিমত রয়েছে।