‘আর এক থেকে সোয়া ঘণ্টা, এরপরই সব ঠিক হয়ে যাবে’—বিমান থেকে নামার পর যাত্রীদের এমন আশ্বাসই দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই এক ঘণ্টা পেরিয়ে কখন যে কয়েক ঘণ্টা, আর কয়েক ঘণ্টা পেরিয়ে প্রায় দুই দিন হয়ে গেছে, তা যেন বুঝতেই পারছেন না রোমের ফিউমিচিনো বিমানবন্দরে আটকে থাকা ঢাকাগামী বাংলাদেশি যাত্রীরা। কারিগরি ত্রুটির কারণে জরুরি অবতরণ করা […]
ছবি: সংগৃহীত
‘আর এক থেকে সোয়া ঘণ্টা, এরপরই সব ঠিক হয়ে যাবে’—বিমান থেকে নামার পর যাত্রীদের এমন আশ্বাসই দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই এক ঘণ্টা পেরিয়ে কখন যে কয়েক ঘণ্টা, আর কয়েক ঘণ্টা পেরিয়ে প্রায় দুই দিন হয়ে গেছে, তা যেন বুঝতেই পারছেন না রোমের ফিউমিচিনো বিমানবন্দরে আটকে থাকা ঢাকাগামী বাংলাদেশি যাত্রীরা।
কারিগরি ত্রুটির কারণে জরুরি অবতরণ করা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের বিজি৩০৬ ফ্লাইটের যাত্রীদের বড় একটি অংশ এখনো বিমানবন্দরের লাউঞ্জেই অবস্থান করছেন। শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ যাত্রীদের নিয়ে তৈরি হয়েছে বাড়তি উদ্বেগ। দীর্ঘ অপেক্ষার মধ্যে অনেকে মেঝেতে বসে কিংবা শুয়ে রাত কাটাচ্ছেন বলে অভিযোগ করেছেন যাত্রীরা।
টরন্টো থেকে ঢাকার উদ্দেশে ছেড়ে আসা ফ্লাইটটি যান্ত্রিক সমস্যার কারণে ইতালির রোমে জরুরি অবতরণ করে। যাত্রীদের অভিযোগ, কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের পাসপোর্টধারীদের জন্য আবাসনের ব্যবস্থা করা হলেও বাংলাদেশি পাসপোর্টধারী অনেক যাত্রীকে বিমানবন্দরের লাউঞ্জেই থাকতে হয়েছে।
আড়াই শতাধিক যাত্রী নিয়ে বিজি৩০৬ স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার বিকেল ৫টা ১৮ মিনিটে কানাডার টরন্টো পিয়ারসন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে যাত্রা শুরু করে। প্রায় আট ঘণ্টা উড্ডয়নের পর যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিলে শুক্রবার সকাল ৭টা ১৯ মিনিটে বিমানটি রোমের ফিউমিচিনো বিমানবন্দরে জরুরি অবতরণ করে।
প্রথমদিকে যাত্রীদের বলা হয়েছিল, অল্প সময়ের মধ্যেই সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। কিন্তু সময় গড়াতে থাকলেও ফ্লাইট ছাড়ার বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। একজন যাত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রথমে এক ঘণ্টা ১০ মিনিট থেকে এক ঘণ্টা ২০ মিনিট অপেক্ষা করতে বলা হয়। এরপর ছয়-সাত ঘণ্টা কেটে গেলেও পরিস্থিতি পরিষ্কার করা হয়নি।
পরে যাত্রীদের জানানো হয়, উড়োজাহাজটিতে কারিগরি সমস্যা হয়েছে এবং বিমানবন্দরের নির্দিষ্ট এলাকায় তাদের অপেক্ষা করতে হবে। এতে দ্রুত দেশে ফেরার আশা আরও দীর্ঘ অনিশ্চয়তায় পরিণত হয়।
দীর্ঘ অপেক্ষার সবচেয়ে কঠিন পরিস্থিতির মুখে পড়েছেন শিশু ও বয়স্ক যাত্রীরা। এক যাত্রী জানান, রাত ১১টা থেকে ভোর ৫টা পর্যন্ত একটি লাউঞ্জে থাকার সুযোগ মিললেও সেখানে শোয়ার মতো পর্যাপ্ত জায়গা ছিল না। ফলে অনেকেই মেঝেতে বসে বা শুয়ে রাত পার করেছেন।
তার ভাষায়, খাবার ও ঘুম—দুটো নিয়েই যাত্রীরা সমস্যায় আছেন। শিশুদের নিয়ে যারা ভ্রমণ করছেন, তাদের দুর্ভোগ আরও বেশি। একা ভ্রমণ করা প্রবীণ যাত্রীদেরও পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে কষ্ট হচ্ছে।
যাত্রীদের আরও অভিযোগ, দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও তাদের কাছে পর্যাপ্ত তথ্য পৌঁছানো হয়নি। কেউ কেউ মোবাইল ফোনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট ও লাইভ করে স্বজনদের পরিস্থিতি জানাচ্ছেন।
এক যাত্রী দাবি করেন, প্রথম ১২ ঘণ্টারও বেশি সময় বিমান বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাউকে তাদের কাছে পাওয়া যায়নি। পরে দূতাবাসের একজন প্রতিনিধি এবং বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের একজন প্রতিনিধি সেখানে যান। তবে বিশ্রামের ব্যবস্থা করার কথা বলা হলেও বাস্তবে পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ তার।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, উড়োজাহাজটিতে পর্যাপ্ত জ্বালানি থাকলেও জ্বালানি সঞ্চালন ব্যবস্থায় সমস্যা দেখা দেয়। রোমে প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তা পাওয়ার চেষ্টা করা হলেও তাৎক্ষণিকভাবে প্রত্যাশিত সহযোগিতা মেলেনি বলে জানা গেছে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে বাংলাদেশ থেকে প্রকৌশলী দল এবং প্রয়োজনীয় খুচরা যন্ত্রাংশ রোমে পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বিজি৩০৬ ফ্লাইটের নির্ধারিত উড়োজাহাজ এস২-এজেওয়াই বর্তমানে ‘এয়ারক্রাফট অন গ্রাউন্ড’ (এওজি) অবস্থায় রয়েছে। অর্থাৎ কারিগরি ত্রুটির কারণে সেটি আপাতত উড্ডয়নের উপযোগী নয়।
ত্রুটি মেরামতের জন্য প্রকৌশলী দল ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ বিজি৩০৫ ফ্লাইটে রোমে পাঠানো হচ্ছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রকৌশলী দল পৌঁছানোর পর মেরামতের কাজ শেষ করা গেলে বিজি৩০৬ রোম থেকে ঢাকার উদ্দেশে যাত্রা করতে পারে।
তবে ফ্লাইটটি ঠিক কখন ছাড়বে, তা পুরোপুরি নির্ভর করছে কারিগরি ত্রুটি কত দ্রুত সমাধান করা যায় তার ওপর। বিমান কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, পরিস্থিতির সর্বশেষ তথ্য যাত্রীদের জানানো হবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, কোনো উড়োজাহাজ দীর্ঘ সময় কারিগরি সমস্যায় মাটিতে পড়ে থাকলে শুধু ওই ফ্লাইটের যাত্রীরাই ক্ষতিগ্রস্ত হন না; পুরো ফ্লাইট সূচিতেও এর প্রভাব পড়ে। বিশেষ করে রিজার্ভ উড়োজাহাজ না থাকলে আটকে পড়া যাত্রীদের দ্রুত অন্য বিমানে দেশে ফেরানো কঠিন হয়ে যায়।
বিজি৩০৬-এর ক্ষেত্রেও একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। অন্য কোনো উড়োজাহাজ দিয়ে যাত্রীদের দেশে ফিরিয়ে আনতে গেলে সেই বিমানের নির্ধারিত রুট ও অন্যান্য যাত্রীর ওপরও প্রভাব পড়তে পারে। ফলে একটি ফ্লাইটের কারিগরি ত্রুটি থেকে একাধিক ফ্লাইটের সময়সূচিতে পরিবর্তনের আশঙ্কা তৈরি হয়।
একটি উড়োজাহাজ দীর্ঘ সময় বিমানবন্দরে পড়ে থাকার সঙ্গে বড় অঙ্কের অতিরিক্ত ব্যয়ও যুক্ত হয়। পার্কিং বা বিমানবন্দর ব্যবহারের চার্জের পাশাপাশি যাত্রীদের খাবার ও আবাসন, ক্রু ব্যবস্থাপনা, প্রকৌশলী দল পাঠানো এবং যন্ত্রাংশ পরিবহনের খরচও বাড়তে থাকে।
সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের মতে, উড়োজাহাজের আকার, পার্কিংয়ের স্থান এবং বিমানবন্দরের নির্ধারিত চার্জের ওপর এই ব্যয়ের পরিমাণ নির্ভর করে। বড় উড়োজাহাজের ক্ষেত্রে খরচ তুলনামূলক বেশি হতে পারে।
রোমে আটকে থাকা যাত্রীদের অভিযোগের বড় অংশ এখন ফ্লাইট কখন ছাড়বে, সেই প্রশ্নের পাশাপাশি খাবার ও বিশ্রামের ব্যবস্থা ঘিরে। বিশেষ করে বাংলাদেশি পাসপোর্টধারী যাত্রীদের জন্য আবাসনের ব্যবস্থা না থাকায় ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।
এক যাত্রীর প্রশ্ন, কোনো আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বিদেশের বিমানবন্দরে কারিগরি সমস্যায় পড়লে যাত্রীদের ন্যূনতম বিশ্রাম, খাবার ও নিরাপদ অবস্থানের দায়িত্ব কার—এ বিষয়ে স্পষ্ট ব্যবস্থা থাকা উচিত।
তার মতে, যান্ত্রিক ত্রুটি যেকোনো সময় হতে পারে। কিন্তু এমন পরিস্থিতিতে যাত্রীদের দীর্ঘ সময় অনিশ্চয়তার মধ্যে রেখে দেওয়া কোনোভাবেই কাম্য নয়।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের পরিচালনা পর্ষদের সাবেক সদস্য এবং বিমান চলাচল ও পর্যটন খাতের বিশ্লেষক কাজী ওয়াহিদুল আলম জানান, সমস্যা সমাধানে বাংলাদেশ থেকে প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ ও প্রকৌশলী দল পাঠানো হয়েছে।
বাংলানিউজকে তিনি বলেন, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত সমাধানের চেষ্টা করছে। প্রকৌশলী দল রোমে পৌঁছানোর পর ত্রুটি মেরামত করা সম্ভব হলে দ্রুতই ফ্লাইটটি ঢাকার উদ্দেশে রওনা দিতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
রোমে প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তা পাওয়ার ক্ষেত্রে কিছুটা ঘাটতি ছিল বলেও উল্লেখ করেন তিনি। তার মতে, ভবিষ্যতে এ ধরনের পরিস্থিতি এড়াতে স্থানীয় গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং এজেন্ট ও ইঞ্জিনিয়ারিং সাপোর্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আরও কার্যকর সমন্বয় প্রয়োজন।
একই সঙ্গে কোনো ফ্লাইটকে কারিগরি কারণে অন্য দেশে অবতরণ করতে হলে সেখানে কী ধরনের প্রকৌশলগত সহায়তা পাওয়া যাবে, সে বিষয়ে আগাম প্রস্তুতি ও বিকল্প পরিকল্পনা রাখার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।
সব মিলিয়ে, রোমে আটকে থাকা বিজি৩০৬-এর যাত্রীদের অপেক্ষার অবসান এখন নির্ভর করছে একটি বিষয়েই—কারিগরি ত্রুটি কত দ্রুত মেরামত করা যায়। তবে তার আগ পর্যন্ত শিশু, প্রবীণ ও অসুস্থ যাত্রীদের দীর্ঘ অপেক্ষা কীভাবে কিছুটা স্বস্তিদায়ক করা যায়, সেটিই এখন সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।