ঢাকায় বসবাসকারী শতভাগ শিশুর দেহে বিষাক্ত ভারী ধাতু সিসার উপস্থিতি পাওয়া গেছে, যা শুধু উদ্বেগজনক নয়, জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকিস্বরূপ। কেননা ঢাকার ৯৮ শতাংশ শিশুরই রক্তে সিসা রয়েছে উদ্বেগজনক মাত্রার বেশি। বুধবার মহাখালীর আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণাকেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি) মিলনায়তনে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় উত্থাপিত গবেষণা প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা গেছে। উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টারস ফর […]
ঢাকায় বসবাসকারী শতভাগ শিশুর দেহে বিষাক্ত ভারী ধাতু সিসার উপস্থিতি পাওয়া গেছে, যা শুধু উদ্বেগজনক নয়, জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকিস্বরূপ। কেননা ঢাকার ৯৮ শতাংশ শিশুরই রক্তে সিসা রয়েছে উদ্বেগজনক মাত্রার বেশি।
বুধবার মহাখালীর আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণাকেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি) মিলনায়তনে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় উত্থাপিত গবেষণা প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা গেছে। উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি) শিশুর প্রতি লিটার রক্তে ৩৫ মাইক্রোগ্রামের বেশি সিসার উপস্থিতিকে উদ্বেগজনক মনে করে।
আর ঢাকায় ২০২২ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সময়ে পরিচালিত গবেষণার প্রাথমিক ফলাফলে দেখা গেছে, ৯৮ শতাংশ শিশুর রক্তেই এ মাত্রার বেশি সিসা রয়েছে। কেবল ঢাকায় নয়, সারা দেশের শিশুরাই এক্ষেত্রে উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে। ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে সিসা দূষণে আক্রান্ত দেশের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান চতুর্থ। এখানে প্রায় ৩ কোটি ৬০ লাখ শিশু রক্তে উচ্চমাত্রার সিসা নিয়ে জীবনধারণ করছে। বিষয়টিতে অবিলম্বে বিশেষ দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করি আমরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সিসা শিশুদের মস্তিষ্কের বিকাশ মারাত্মকভাবে ব্যাহত করে। এর ফলে বুদ্ধিমত্তা ও শেখার ক্ষমতা কমে যায়, যা পরবর্তী প্রজন্মের ওপর স্থায়ী প্রভাব ফেলে। সিসার প্রভাবে শিশুদের বুদ্ধিমত্তার বিকাশই যে শুধু ব্যাহত হয় তা নয়; দৈহিক গঠনও বাধাগ্রস্ত হয়। এক গবেষণায় পাওয়া গেছে, শৈশবে যাদের রক্তে সিসার মাত্রাতিরিক্ত উপস্থিতি থাকে, বড় হয়ে তাদের দেহে নানারকম জটিলতা সৃষ্টির আশঙ্কা বেশি। সংগত কারণেই আইসিডিডিআর,বির নির্বাহী পরিচালক ডা. তাহমিদ আহমেদ বলেছেন, সিসার বিষক্রিয়া নীরবে আমাদের শিশুদের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা কেড়ে নিচ্ছে। সিসা দূষণের বিরুদ্ধে এখনই কঠোর পদক্ষেপ না নিলে দেশের কয়েক লাখ শিশু বুদ্ধিবিকাশজনিত স্থায়ী ক্ষতির মুখে পড়বে বলে সতর্ক করে দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
শিশু তথা মানবরক্তে সিসার উপস্থিতি রোধে যা করণীয় তা হলো, পরিবেশে সিসা দূষণ বন্ধ করা। মূলত মাটি, বাতাস, শিশুদের খেলনা, খাবার, মসলা, পানি ও রঙে থাকা সিসার কারণে মানবস্বাস্থ্য ও পরিবেশের ক্ষতি হচ্ছে। বাংলাদেশ যদিও হলুদে সিসা মেশানো বন্ধ করেছে, তারপরও অন্য নানাভাবে সিসার দূষণ ঘটছে। গবেষণায় উঠে এসেছে, সিসানির্ভর শিল্পপ্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে লেড-অ্যাসিড ব্যাটারি উৎপাদন ও রিসাইক্লিং কারখানা, সিসা গলানোর কেন্দ্র এই দূষণের প্রধান উৎস। এছাড়া বাড়ির ভেতরে ধূমপান, ধূলিকণা, সিসাযুক্ত প্রসাধনী ও রান্নার পাত্র থেকেও শিশুদের শরীরে সিসা ঢুকছে। গবেষণায় আরও পাওয়া গেছে, রাজধানীর আশপাশে সিসানির্ভর কারখানার ১ কিলোমিটারের মধ্যে বসবাসকারী শিশুদের রক্তে সিসার মাত্রা অন্যদের তুলনায় ৪৩ শতাংশ বেশি। আইসিডিডিআর,বির সাবেক পরিচালক স্টিভ লুবি বলেছেন, ‘আমরা নিঃশ্বাসের সঙ্গে যে বাতাস নিই, যে খাবার খাই, দূষিত মাটি বা ধূলিকণা স্পর্শ করি এবং এমনকি গর্ভাবস্থায় মায়ের প্লাসেন্টা (গর্ভফুল) থেকেও সিসা আমাদের শরীরে প্রবেশ করে। এই বহুবিধ উপায়ে সিসা প্রবেশ করে বলে এর থেকে বাঁচতে হলে এর মূল উৎসগুলো বন্ধ করা জরুরি।’ শিশুদের ভবিষ্যৎ সুন্দর করতে এ বিষাক্ত উপাদানটির মূল উৎসগুলো বন্ধ করার জন্য তাই কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করি আমরা।