যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন আইন প্রয়োগ নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। দেশটির অভিবাসন ও কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট বা আইসিই কর্মকর্তাদের ওয়ারেন্ট ছাড়া গ্রেপ্তারের ক্ষমতা প্রয়োগের ব্যাখ্যায় পরিবর্তন এসেছে। একই সময়ে সংস্থাটির মাঠপর্যায়ের কার্যক্রমে শরীরে সংযুক্ত ক্যামেরার ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে কেন্দ্রীয় পর্যায়ে আইসিইর ক্ষমতা প্রয়োগের পরিধি বাড়ার বিপরীতে ম্যাসাচুসেটসের মতো কয়েকটি অঙ্গরাজ্য স্থানীয় সংস্থার মাধ্যমে […]
ছবি: সংগৃহীত
যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন আইন প্রয়োগ নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। দেশটির অভিবাসন ও কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট বা আইসিই কর্মকর্তাদের ওয়ারেন্ট ছাড়া গ্রেপ্তারের ক্ষমতা প্রয়োগের ব্যাখ্যায় পরিবর্তন এসেছে। একই সময়ে সংস্থাটির মাঠপর্যায়ের কার্যক্রমে শরীরে সংযুক্ত ক্যামেরার ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে কেন্দ্রীয় পর্যায়ে আইসিইর ক্ষমতা প্রয়োগের পরিধি বাড়ার বিপরীতে ম্যাসাচুসেটসের মতো কয়েকটি অঙ্গরাজ্য স্থানীয় সংস্থার মাধ্যমে অভিবাসন আইন প্রয়োগে সহযোগিতা সীমিত করতে নতুন আইন করছে।
১২ আগস্ট পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ওয়ারেন্ট ছাড়া গ্রেপ্তারের এই ক্ষমতা আইসিইর জন্য সম্পূর্ণ নতুন নয়। যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় অভিবাসন আইনে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে আইসিই কর্মকর্তাদের প্রশাসনিক ওয়ারেন্ট ছাড়াই কাউকে গ্রেপ্তারের সুযোগ আগে থেকেই রয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি অভিবাসন আইন লঙ্ঘন করে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন এবং ওয়ারেন্ট সংগ্রহের আগেই তিনি পালিয়ে যেতে পারেন—এমন যথেষ্ট আইনি ভিত্তি থাকতে হয়।
আইসিইর ভারপ্রাপ্ত পরিচালক টড লায়ন্স গত ২৮ জানুয়ারি একটি অভ্যন্তরীণ স্মারকের মাধ্যমে ওয়ারেন্টবিহীন গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রে ‘সরে যাওয়ার সম্ভাবনা’ সংক্রান্ত বিধানের নতুন ব্যাখ্যা দেন। পরে আদালতে জমা দেওয়া নথির মাধ্যমে ওই নির্দেশনার বিস্তারিত প্রকাশ্যে আসে।
আগের ব্যাখ্যায় ওয়ারেন্ট ছাড়া গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ভবিষ্যতে আদালতের শুনানি বা অভিবাসন-সংক্রান্ত প্রক্রিয়ায় হাজির হবেন না—এমন আশঙ্কা বিবেচনা করা হতো। নতুন ব্যাখ্যায় এই বিষয়টি এবং ঘটনাস্থল থেকে তাৎক্ষণিকভাবে সরে যাওয়ার সম্ভাবনাকে আলাদা করে দেখা হচ্ছে।
এখন আইসিই কর্মকর্তাকে বিবেচনা করতে হবে, প্রশাসনিক গ্রেপ্তারি ওয়ারেন্ট সংগ্রহ করতে যে সময় প্রয়োজন, সেই সময়ের মধ্যে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে একই জায়গা বা অন্য কোনো নির্দিষ্ট স্থানে পাওয়া যাবে কি না। অর্থাৎ ভবিষ্যতে তিনি আদালতে হাজির হবেন কি না, তার চেয়ে তাৎক্ষণিকভাবে ঘটনাস্থল থেকে সরে যাওয়ার সম্ভাবনার ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে আইসিই কোনো ব্যক্তিকে ইচ্ছামতো ওয়ারেন্ট ছাড়া গ্রেপ্তার করতে পারবে। নির্দেশনা অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি যুক্তরাষ্ট্র থেকে অপসারণযোগ্য এবং ওয়ারেন্ট পাওয়ার আগেই সরে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে—দুই ক্ষেত্রেই কর্মকর্তার যথেষ্ট আইনি ভিত্তি থাকতে হবে। গ্রেপ্তারের পর সেই সিদ্ধান্তের পক্ষে বিবেচিত কারণ নথিভুক্ত করার নির্দেশনাও রয়েছে।
আইসিইর নির্দিষ্ট লক্ষ্যভিত্তিক অভিযানে কর্মকর্তাদের সম্ভব হলে আগে থেকেই প্রশাসনিক গ্রেপ্তারি ওয়ারেন্ট সংগ্রহ করতে বলা হয়েছে। তবে অভিযান চলাকালে মূল লক্ষ্যবহির্ভূত অন্য কোনো সম্ভাব্য অপসারণযোগ্য অভিবাসীর সন্ধান পাওয়া গেলে এবং তাৎক্ষণিকভাবে ওয়ারেন্ট সংগ্রহ করা সম্ভব না হলে নতুন ব্যাখ্যার অধীনে তাকে ওয়ারেন্ট ছাড়াই গ্রেপ্তারের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
এই নীতির বৈধতা নিয়েও আদালতে বিরোধ চলছে। কলোরাডোর একটি কেন্দ্রীয় আদালত এর আগে জানিয়েছে, শুধু যুক্তরাষ্ট্রে অবৈধভাবে অবস্থানের সন্দেহ ওয়ারেন্টবিহীন গ্রেপ্তারের জন্য যথেষ্ট নয়। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ওয়ারেন্ট পাওয়ার আগেই সরে যেতে পারেন—এমন সিদ্ধান্তেরও ব্যক্তি ও পরিস্থিতিভিত্তিক আইনি ভিত্তি থাকতে হবে।
ওয়ারেন্টবিহীন গ্রেপ্তারের ব্যাখ্যার পাশাপাশি আইসিইর শরীরে সংযুক্ত ক্যামেরা কর্মসূচিতেও বড় পরিবর্তন আনা হচ্ছে। জুলাইয়ে টেক্সাস ও মেইনে আইসিই কর্মকর্তাদের পৃথক অভিযানে দুই অভিবাসী নিহত হওয়ার পর সংস্থাটির কার্যক্রমে স্বচ্ছতা নিয়ে কংগ্রেস ও জনপরিসরে চাপ বাড়ে। ওই ঘটনাগুলোর পূর্ণাঙ্গ ক্যামেরা রেকর্ড না থাকায়ও প্রশ্ন ওঠে।
প্রাথমিকভাবে সেপ্টেম্বরের শেষ নাগাদ দেশজুড়ে কর্মকর্তাদের শরীরে সংযুক্ত ক্যামেরা চালুর কথা বলা হলেও, ৮ আগস্ট আইসিইর ভারপ্রাপ্ত পরিচালক ডেভিড ভেনচুরেলা জানান, আগস্টের শেষ নাগাদ সব কর্মকর্তা ও এজেন্টের কাছে ক্যামেরা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে।
জুলাইয়ে এসব ক্যামেরা কেনার জন্য প্রায় ৩ কোটি ৯ লাখ ডলার ব্যয়ের তথ্যও সামনে আসে। গাড়ি থামিয়ে পরিচালিত অভিবাসন আইন প্রয়োগের সময় অন্তত একটি ক্যামেরায় ঘটনা ধারণ করার নির্দেশনার কথাও জানানো হয়েছে।
তবে ক্যামেরা চালুর পাশাপাশি এসব ভিডিও প্রকাশের নীতিও বিতর্কের বিষয় হয়ে উঠেছে। মৃত্যু বা গুরুতর আহত হওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ ঘটনায় ধারণ করা ফুটেজ প্রকাশের ক্ষেত্রে আইসিইর উচ্চপর্যায়ের পর্যালোচনা ও পরিচালকের সিদ্ধান্তের সুযোগ রয়েছে। পরিস্থিতি অনুযায়ী ভিডিও প্রকাশ বিলম্বিত বা আটকে রাখা হতে পারে। পাশাপাশি প্রকাশিত ফুটেজে কর্মকর্তাদের পরিচয় ও অন্যান্য সংবেদনশীল তথ্য গোপন করা হতে পারে।
কেন্দ্রীয় পর্যায়ে আইসিইর কার্যক্রম বাড়লেও ম্যাসাচুসেটস এ ক্ষেত্রে ভিন্ন পথে হাঁটছে। অঙ্গরাজ্যটির গভর্নর মওরা হিলি ৫ আগস্ট একটি বিস্তৃত অভিবাসন সুরক্ষা আইনে স্বাক্ষর করেন। ‘প্রোটেক্ট অ্যাক্ট’ নামে পরিচিত এই আইনে স্কুল, শিশু পরিচর্যা কেন্দ্র, আদালত ভবন ও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের মতো সংবেদনশীল স্থানে বেসামরিক অভিবাসন আইন প্রয়োগের ওপর নতুন বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।
আইনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো রাজ্য ও স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলোর নতুন ২৮৭(জি) চুক্তিতে অংশ নেওয়ার সুযোগ সীমিত করা। এসব চুক্তির মাধ্যমে নির্দিষ্ট স্থানীয় কর্মকর্তারা কেন্দ্রীয় অভিবাসন আইনের কিছু দায়িত্ব পালনের ক্ষমতা পেতে পারেন। নতুন আইনে বেসামরিক অভিবাসন আইন প্রয়োগের কাজে রাজ্য ও স্থানীয় সরকারি সম্পদ ব্যবহারের ক্ষেত্রেও সীমাবদ্ধতা আনা হয়েছে।
তবে ম্যাসাচুসেটসের আইনকে সরাসরি ‘আইসিই নিষিদ্ধ’ করার আইন বলা ঠিক হবে না। কেন্দ্রীয় সংস্থা হিসেবে আইসিই অঙ্গরাজ্যটিতে কেন্দ্রীয় অভিবাসন আইন প্রয়োগ করতে পারবে। নতুন আইনের মূল লক্ষ্য হলো নির্দিষ্ট সংবেদনশীল স্থানে বেসামরিক অভিবাসন গ্রেপ্তার সীমিত করা এবং কেন্দ্রীয় অভিবাসন আইন প্রয়োগের কাজে রাজ্য ও স্থানীয় সংস্থার অংশগ্রহণ কমানো।
ফলে যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন আইন প্রয়োগ নিয়ে এখন দুটি বিপরীতমুখী প্রবণতা স্পষ্ট। কেন্দ্রীয় পর্যায়ে আইসিই ওয়ারেন্টবিহীন গ্রেপ্তারের বিদ্যমান ক্ষমতাকে আরও বিস্তৃতভাবে ব্যাখ্যা করছে এবং মাঠপর্যায়ে শরীরে সংযুক্ত ক্যামেরার ব্যবহার বাড়াচ্ছে। অন্যদিকে ম্যাসাচুসেটসের মতো অঙ্গরাজ্যগুলো নিজেদের আইন ও সরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় বেসামরিক অভিবাসন আইন প্রয়োগে সহযোগিতার সীমা সংকুচিত করছে।