ক্রমেই বাড়তে থাকা তাপপ্রবাহ এবং অতিরিক্ত গরমের ঝুঁকির মুখে কর্মরত শ্রমিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে নিউইয়র্ক সিটি প্রশাসন। এ লক্ষ্যে মেয়র জোহরান মামদানি একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষর করেছেন, যার মাধ্যমে শহরের শ্রমিকদের জন্য বাধ্যতামূলক ‘হিট সেফটি’ বা তাপ-নিরাপত্তা পরিকল্পনা চালু করা হচ্ছে। এই উদ্যোগের আওতায় প্রথমবারের মতো নিউইয়র্ক সিটিতে তাপজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় […]
ছবি: সংগৃহীত
ক্রমেই বাড়তে থাকা তাপপ্রবাহ এবং অতিরিক্ত গরমের ঝুঁকির মুখে কর্মরত শ্রমিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে নিউইয়র্ক সিটি প্রশাসন। এ লক্ষ্যে মেয়র জোহরান মামদানি একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষর করেছেন, যার মাধ্যমে শহরের শ্রমিকদের জন্য বাধ্যতামূলক ‘হিট সেফটি’ বা তাপ-নিরাপত্তা পরিকল্পনা চালু করা হচ্ছে।
এই উদ্যোগের আওতায় প্রথমবারের মতো নিউইয়র্ক সিটিতে তাপজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় বিভিন্ন সরকারি সংস্থার সমন্বয়ে একটি ‘সমগ্র-সরকার’ ভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে। প্রশাসনের মতে, দীর্ঘদিন ধরে চরম গরমে কাজ করা শ্রমিকরা পর্যাপ্ত সুরক্ষা সুবিধা থেকে বঞ্চিত ছিলেন। নতুন এই পদক্ষেপ সেই ঘাটতি দূর করার লক্ষ্যেই নেওয়া হয়েছে।
সিটি হলে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে শ্রমিক ইউনিয়নের প্রতিনিধি, বিভিন্ন কমিউনিটি সংগঠনের সদস্য, সিটি প্রশাসনের কর্মকর্তাসহ শ্রমিক প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে এই নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষর করেন মেয়র জোহরান মামদানি।
অনুষ্ঠানে মেয়র বলেন, কোনো শ্রমিককে কখনোই তার জীবিকা ও স্বাস্থ্য সুরক্ষার মধ্যে একটি বেছে নিতে বাধ্য করা উচিত নয়। তিনি বলেন, যারা প্রতিদিন আকাশচুম্বী ভবন নির্মাণ করছেন, পণ্য সরবরাহ করছেন, রাস্তার পাশে খাবার বিক্রি করছেন কিংবা শহরের নিত্যদিনের কার্যক্রম সচল রাখতে কাজ করছেন, তাদের প্রত্যেকেরই নিরাপদে বাড়ি ফেরার অধিকার রয়েছে।
মামদানি আরও বলেন, এতদিন চরম তাপমাত্রার পুরো চাপ শ্রমজীবী মানুষের ওপরই পড়ে এসেছে। এখন সেই বাস্তবতা বদলানোর সময় এসেছে, কারণ প্রতিটি শ্রমিকের জীবন ও নিরাপত্তা সমানভাবে মূল্যবান।
নির্বাহী আদেশ অনুযায়ী, নিউইয়র্ক সিটির স্বাস্থ্য ও মানসিক স্বাস্থ্য বিভাগ, জরুরি ব্যবস্থাপনা বিভাগ এবং প্রশাসনিক সেবা বিভাগ যৌথভাবে বহুভাষিক তাপ-নিরাপত্তা নির্দেশিকা প্রস্তুত ও বিতরণ করবে। চলতি বছরের মধ্যেই বাইরে কর্মরত শ্রমিকদের জন্য এই নির্দেশিকা প্রকাশ করা হবে।
এছাড়া ২০২৭ সালের ১ মার্চের মধ্যে ভবনের অভ্যন্তরে কাজ করা শ্রমিকদের জন্য পৃথক নিরাপত্তা নির্দেশিকাও তৈরি ও কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে।
নতুন আদেশের আওতায় নিউইয়র্ক সিটির প্রতিটি মেয়রাল এজেন্সিকে তাদের কর্মচারী ও ঠিকাদারদের জন্য বাধ্যতামূলক ‘হিট ইলনেস প্রিভেনশন প্ল্যান’ বা তাপজনিত অসুস্থতা প্রতিরোধ পরিকল্পনা তৈরি এবং বাস্তবায়নের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
একই সঙ্গে স্বাস্থ্য বিভাগকে চরম গরম এবং শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণ দাবির মধ্যে সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি তাপজনিত অসুস্থতাকে বাধ্যতামূলকভাবে রিপোর্টযোগ্য স্বাস্থ্যঝুঁকি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার প্রয়োজনীয়তা পর্যালোচনার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে, নিউইয়র্ক সিটি ভবন বিভাগকে নির্মাণ প্রকল্পগুলোতে বর্তমানে কার্যকর থাকা তাপ-নিরাপত্তা নীতিমালা পর্যালোচনা করে আরও কার্যকর সুপারিশ তৈরির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে চূড়ান্ত প্রতিবেদন ২০২৭ সালের ১ মার্চের মধ্যে জমা দেওয়ার নির্দেশ রয়েছে।
তাপপ্রবাহ মোকাবিলায় প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাও গ্রহণ করছে সিটি প্রশাসন। সম্প্রতি মেয়র মামদানি তাপজনিত অসুস্থতার উপসর্গ ও প্রতিরোধ বিষয়ে সচেতনতা তৈরির লক্ষ্যে একটি জনসচেতনতামূলক ভিডিও প্রকাশ করেছেন।
এছাড়া নিউইয়র্ক সিটির ইতিহাসে প্রথমবারের মতো শহরের দুই হাজার ২০০-এর বেশি জনসেবা কিয়স্কে নিকটবর্তী শীতলীকরণ কেন্দ্রের অবস্থান এবং সেখানে পৌঁছানোর দিকনির্দেশনা প্রদর্শন করা হবে। জরুরি তাপ পরিস্থিতিতে এসব কেন্দ্র খোলা বা বন্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে হালনাগাদ হবে।
সিটি প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, নিউইয়র্ক সিটির প্রায় ১৪ লাখ শ্রমিক প্রতি গ্রীষ্ম মৌসুমে দীর্ঘ সময় বাইরে কাজ করেন। এটি শহরের মোট কর্মশক্তির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। এই শ্রমিকদের মধ্যে নির্মাণশ্রমিক, দিনমজুর, রাস্তার হকার, ডেলিভারি কর্মী, ট্রাকচালক এবং গুদাম শ্রমিকরা রয়েছেন।
প্রতিবছর নিউইয়র্ক সিটিতে তাপজনিত কারণে প্রায় ৫০০ মানুষের মৃত্যু ঘটে। ফলে চরম গরম বর্তমানে শহরের অন্যতম প্রাণঘাতী আবহাওয়াজনিত ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে বলে মনে করছে প্রশাসন।
এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছেন বিভিন্ন সরকারি কর্মকর্তা এবং শ্রমিক সংগঠনের নেতারা। নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের অ্যাটর্নি জেনারেল লেটিশিয়া জেমস বলেন, জীবিকা অর্জনের জন্য কোনো শ্রমিককে নিজের জীবন ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে হওয়া উচিত নয়। তিনি দীর্ঘদিন ধরে শ্রমিকদের জন্য শক্তিশালী তাপ-সুরক্ষা ব্যবস্থার দাবি জানিয়ে আসছিলেন এবং এ উদ্যোগের জন্য মেয়র মামদানিকে ধন্যবাদ জানান।
অর্থনৈতিক ন্যায়বিচারবিষয়ক ডেপুটি মেয়র জুলি স্যু বলেন, শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এই প্রশাসনের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার। তাঁর ভাষায়, তাপপ্রবাহ সবার জন্যই ঝুঁকিপূর্ণ হলেও বাইরে কর্মরত শ্রমিকরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েন।
স্বাস্থ্য ও মানবসেবা বিষয়ক ডেপুটি মেয়র হেলেন আটিএগা জানান, নিউইয়র্কে কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠী শ্বেতাঙ্গদের তুলনায় দ্বিগুণ হারে হিট স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছেন। একই সঙ্গে লাতিনো শ্রমিকদেরও কর্মক্ষেত্রে তুলনামূলক বেশি ঝুঁকির মধ্যে কাজ করতে হচ্ছে।
অপারেশনস বিষয়ক ডেপুটি মেয়র জুলিয়া কারসন বলেন, অতিরিক্ত গরম অনেক সময় প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে। যারা প্রতিদিন শহরকে সচল রাখছেন, তাদের জন্য নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা প্রশাসনের দায়িত্ব।
শ্রমিক প্রতিনিধিরাও এই সিদ্ধান্তকে দীর্ঘদিনের দাবির বাস্তবায়ন হিসেবে দেখছেন। লাগার্ডিয়া বিমানবন্দরের র্যাম্প এজেন্ট জন মসকুয়েরা বলেন, প্রচণ্ড গরমে কাজ করার অভিজ্ঞতা অনেকটা ওভেনের ভেতরে অবস্থান করার মতো। তিনি জানান, অতীতে একাধিকবার তিনি নিজেও অসুস্থ হয়েছেন এবং শ্রমিকদের এই সমস্যাকে দীর্ঘদিন যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয়নি।
শ্রমিক সংগঠন ৩২বিজে এসইআইইউ-এর সভাপতি ম্যানি পাস্টরিচ বলেন, অনেক নিয়োগকর্তা এখনো নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হচ্ছেন, যার ফলে শ্রমিকরা গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে পড়ছেন। তাঁর মতে, নতুন এই নির্বাহী আদেশ শ্রমিক সুরক্ষার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি।
সিটি প্রশাসন জানিয়েছে, টেম্প কোয়ালিশন, নিউইয়র্ক কমিটি ফর অকুপেশনাল সেফটি অ্যান্ড হেলথ, ৩২বিজে এসইআইইউসহ কয়েক ডজন শ্রমিক ও কমিউনিটি সংগঠনের সঙ্গে আলোচনা ও মতবিনিময়ের ভিত্তিতে এই নীতিমালা চূড়ান্ত করা হয়েছে।
প্রশাসনের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে চরম গরম ও দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহের ঘটনা দিন দিন বাড়ছে। সেই বাস্তবতায় শ্রমিকদের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা সুরক্ষায় এই উদ্যোগ নিউইয়র্ক সিটির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে।