সম্পূর্ণ নিউজ বাংলা-ভয়েজ

উত্তর আমেরিকা
৬:০৫ পিএম, ৮ আগস্ট ২০২৬

এক্সপ্রেস ট্রিবিউনের বিশ্লেষণ: উভয় সংকটে ট্রাম্প, ওয়াশিংটনের সামনে কঠিন সিদ্ধান্ত

ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ ছয় মাস পেরিয়ে গেছে। কয়েক সপ্তাহের মধ্যে যুদ্ধ শেষ করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে সামরিক অভিযান শুরু করলেও এখন সেখান থেকে বেরিয়ে আসার সহজ কোনো পথ খুঁজে পাচ্ছেন না মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। চলতি সপ্তাহে একদিকে তীব্র হুঁশিয়ারি, অন্যদিকে জোরালো কূটনৈতিক তৎপরতা—সব মিলিয়ে ক্রমেই কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছে তার প্রশাসন। বর্তমানে ট্রাম্পের সামনে […]

এক্সপ্রেস ট্রিবিউনের বিশ্লেষণ: উভয় সংকটে ট্রাম্প, ওয়াশিংটনের সামনে কঠিন সিদ্ধান্ত
নিজস্ব প্রতিবেদক
৫ মিনিটে পড়ুন |

ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ ছয় মাস পেরিয়ে গেছে। কয়েক সপ্তাহের মধ্যে যুদ্ধ শেষ করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে সামরিক অভিযান শুরু করলেও এখন সেখান থেকে বেরিয়ে আসার সহজ কোনো পথ খুঁজে পাচ্ছেন না মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। চলতি সপ্তাহে একদিকে তীব্র হুঁশিয়ারি, অন্যদিকে জোরালো কূটনৈতিক তৎপরতা—সব মিলিয়ে ক্রমেই কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছে তার প্রশাসন।

বর্তমানে ট্রাম্পের সামনে মূলত দুটি কঠিন পথ খোলা রয়েছে। প্রথমত, ওমান ও ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য মধ্যস্থতামূলক চুক্তি মেনে নেওয়া। এতে হরমুজ প্রণালিতে তেহরান এমন কিছু নিয়ন্ত্রণ বা তদারকির সুযোগ পেতে পারে, যা যুদ্ধ শুরুর আগে তাদের ছিল না। দ্বিতীয়ত, যুদ্ধের তীব্রতা আরও বাড়িয়ে নতুন করে বড় ধরনের সামরিক হামলা চালানো। তবে এর ফলে সংঘাত আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, প্রথম পথ বেছে নিলে তা হবে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ হামলার পর ইরানকে দেওয়া সবচেয়ে বড় ছাড়গুলোর একটি। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালিতে ইরানের ভূমিকা সাময়িক হলেও আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে। অথচ ট্রাম্প প্রশাসন এতদিন এই ধরনের পরিস্থিতি প্রতিহত করার অঙ্গীকার করে আসছে।

অন্যদিকে নতুন করে বড় ধরনের বিমান হামলা চালানোও ট্রাম্পের জন্য রাজনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। বিশেষ করে আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে থাকায় এই সিদ্ধান্তের রাজনৈতিক মূল্য দিতে হতে পারে তাকে। আগের হামলাতেও ইরান নতি স্বীকার করেনি। ফলে নতুন হামলায় কাঙ্ক্ষিত সাফল্য পাওয়ার সম্ভাবনা খুব বেশি নয় বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

তৃতীয় একটি পথ হলো বর্তমান নড়বড়ে পরিস্থিতি বজায় রাখা। অর্থাৎ ইরানের বন্দরগুলোতে নৌ-অবরোধ অব্যাহত রাখা এবং মার্কিন জাহাজে হামলার জবাবে মাঝে মাঝে পাল্টা সামরিক অভিযান চালানো। তবে এতেও যুদ্ধ থেকে সম্মানজনকভাবে বেরিয়ে আসার কোনো স্পষ্ট পথ তৈরি হবে না। একই সঙ্গে মধ্য এপ্রিলের মধ্যেই যুদ্ধ শেষ হয়ে যাবে—এমন প্রাথমিক ধারণার সঙ্গেও এই পরিস্থিতির কোনো মিল নেই।

সাবেক মধ্যপ্রাচ্য মধ্যস্থতাকারী অ্যারন ডেভিড মিলারের মতে, ট্রাম্পের সামনে এখন খারাপ বিকল্পের একটি দীর্ঘ তালিকা রয়েছে। তার ধারণা, ট্রাম্প হয়তো বুঝতে পারছেন যে এই যুদ্ধ অনির্দিষ্টকাল চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। ফলে কোনো না কোনো জায়গায় ছাড় দিতেই হবে। সেই ছাড়ের একটি সম্ভাব্য ক্ষেত্র হতে পারে হরমুজ প্রণালিতে ইরানের নতুন বাস্তবতাকে মেনে নেওয়া।

রয়টার্সের প্রশ্নের জবাবে এক মার্কিন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, যেকোনো সাময়িক নৌচলাচল ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বাধাহীন থাকবে এবং কোনো একটি পক্ষের নিয়ন্ত্রণে থাকবে না।

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও অবশ্য স্পষ্টভাবে বলেছেন, বিশ্বের তেল ও এলএনজি পরিবহনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হরমুজ প্রণালি কোনোভাবেই ইরানের নিয়ন্ত্রণে বা তাদের ফি আদায়ের আওতায় থাকতে পারে না। এটিকে উন্মুক্ত আন্তর্জাতিক পানিপথ হিসেবে রাখতে হবে। তবে ট্রাম্প এর আগেও যুদ্ধসংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে রুবিওর বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছেন। এবারও তার ব্যতিক্রম নাও হতে পারে বলে ধারণা বিশ্লেষকদের।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রে গ্যাসের দাম বেড়েছে, ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কমছে এবং সাধারণ আমেরিকানদের মধ্যে যুদ্ধ নিয়ে অসন্তোষ বাড়ছে। ফলে প্রেসিডেন্টের রাজনৈতিক পরিসর ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। যুদ্ধ যত দীর্ঘায়িত হচ্ছে, হুমকি দিয়ে ইরানকে নতি স্বীকার করানো তত কঠিন হয়ে পড়ছে। বরং শেষ পর্যন্ত ট্রাম্পকেই বড় কোনো ছাড় দিতে হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করা এখন আলোচনার টেবিলে ফেরার অন্যতম প্রধান শর্ত। ওয়াশিংটন চায়, আলোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দু হোক ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, যা সামরিক অভিযানের ঘোষিত অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল।

তবে ইরান-ওমান সম্ভাব্য চুক্তি যুক্তরাষ্ট্র মেনে নেবে কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। ইরানের এক জ্যেষ্ঠ সূত্র এবং আঞ্চলিক দুজন কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, প্রস্তাবিত শর্ত অনুযায়ী পারস্য উপসাগরে প্রবেশকারী জাহাজগুলোর ওপর তেহরান কিছু তদারকি বা নিয়ন্ত্রণের সুযোগ পেতে পারে। ট্রাম্প জলপথ চালুর চুক্তিকে ‘আসন্ন’ বলে উল্লেখ করলেও ইরানি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এর অনেক খুঁটিনাটি বিষয় এখনো অমীমাংসিত।

এমনকি চুক্তি চূড়ান্ত হলেও বা আলোচনা আবার শুরু হলেও চূড়ান্ত শান্তিচুক্তি নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে সংশয় রয়েছে। জুন মাসে তৈরি করা একটি খসড়া সমঝোতা স্মারক ইতোমধ্যেই ব্যর্থ হয়েছে। ওই প্রস্তাবে ইরানকে শুরুতেই কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল, যা রিপাবলিকান পার্টির ভেতরেই তীব্র সমালোচনার জন্ম দেয়।

হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের সময়ও কোনো না কোনোভাবে এই যুদ্ধ চলতে থাকবে—এমন বাস্তবতা প্রশাসনের কর্মকর্তারা মেনে নিচ্ছেন। সেপ্টেম্বর থেকেই কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে আগাম ভোটগ্রহণ শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।

ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার সময় বিদেশনীতিতে অযথা হস্তক্ষেপ না করা এবং আমেরিকানদের অর্থনৈতিক সমস্যায় বেশি মনোযোগ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। বর্তমান পরিস্থিতি সেই প্রতিশ্রুতির সম্পূর্ণ বিপরীত। ফলে কংগ্রেসে সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখার লড়াইয়ে থাকা রিপাবলিকানদের জন্য এটি বড় রাজনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করছে।

তবে এক মার্কিন কর্মকর্তা দাবি করেছেন, ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত কোনো জনমত জরিপের ওপর নির্ভর করে না। ট্রাম্প নিয়মিতই দাবি করে আসছেন, ইরানের বেশ কয়েকজন নেতাকে হত্যা এবং দেশটির সামরিক সক্ষমতা ধ্বংস করে তিনি জয়ী হয়েছেন। কিন্তু অধিকাংশ বিশ্লেষকের মতে, যুদ্ধের ঘোষিত মূল লক্ষ্য অর্জনে তিনি এখনো সফল হননি।

সম্প্রতি ট্রাম্প জানিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্যের মিত্র দেশগুলোর কূটনৈতিক উদ্যোগের সুযোগ দেওয়ার অনুরোধের কারণে তিনি বড় ধরনের নতুন হামলার পরিকল্পনা স্থগিত করেছেন। তবে কূটনীতি ব্যর্থ হলে কঠোর সামরিক আঘাত হানার হুমকিও দিয়ে রেখেছেন। কিছু বিশ্লেষকের মতে, মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত কমে যাওয়ার উদ্বেগও এই সিদ্ধান্তের পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে। যদিও ট্রাম্প অস্ত্র সংকটের বিষয়টি অস্বীকার করেছেন।

লাস ভেগাসে এক সমাবেশে ট্রাম্প বলেন, তিনি চুক্তি করতেই বেশি পছন্দ করবেন, কারণ তিনি মানুষ হত্যা করতে চান না। তবে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে গেলে সামরিক পদক্ষেপও নিতে হতে পারে বলে জানান তিনি।

অন্যদিকে ইরান ওয়াশিংটনের উপসাগরীয় মিত্রদের সতর্ক করে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে হামলা চালালে তাদের জ্বালানি অবকাঠামোতেও পাল্টা আঘাত হানা হতে পারে।

সাবেক মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তা জোনাথন প্যানিকফের মতে, চীন, রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়া এই যুদ্ধ খুব ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। তার ভাষ্য, আগামী বছরগুলোতে মার্কিন সামরিক সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা কোথায়—এসব দেশ এখন তা বোঝার চেষ্টা করছে।

এমনকি যারা ইরানবিরোধী নীতিকে সমর্থন করেছিলেন, তাদের কেউ কেউ এখন সতর্ক থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন। ফাউন্ডেশন ফর ডিফেন্স অব ডেমোক্রেসির গবেষক বেনাম বেন তালেবলু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান নভেম্বরের আগে ট্রাম্প প্রশাসনকে একটি উভয় সংকটে ফেলার চেষ্টা করছে। তার মতে, প্রশাসনের উচিত তাড়াহুড়ো করে কোনো সিদ্ধান্ত না নেওয়া এবং নিজেদের প্রকৃত সক্ষমতা ও সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে বাস্তবসম্মত ধারণা রাখা।

সূত্র: এক্সপ্রেস ট্রিবিউন

Facebook Comments Box
Advertise with us
এ বিভাগের আরও খবর


আর্কাইভ ক্যালেণ্ডার
Su Mo Tu We Th Fr Sa
Advertise with us
আরও বাংলা-ভয়েজ সংবাদ