নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরুর মাত্র কয়েক দিন আগে ইউক্রেনের প্রকাশনা ও মুদ্রণশিল্পে বড় ধাক্কা দিয়েছে একের পর এক রুশ হামলা। সাম্প্রতিক এসব হামলায় দেশটির প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ বই ধ্বংস হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদন ও স্থানীয় গণমাধ্যমের তথ্য থেকে জানা গেছে। এর মধ্যে বিপুলসংখ্যক স্কুলের পাঠ্যবইও রয়েছে। কিয়েভের উপকণ্ঠে একটি ছাপাখানায় রাতের হামলায় প্রতিষ্ঠানটির ভবন […]
ছবি: সংগৃহীত
নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরুর মাত্র কয়েক দিন আগে ইউক্রেনের প্রকাশনা ও মুদ্রণশিল্পে বড় ধাক্কা দিয়েছে একের পর এক রুশ হামলা। সাম্প্রতিক এসব হামলায় দেশটির প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ বই ধ্বংস হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদন ও স্থানীয় গণমাধ্যমের তথ্য থেকে জানা গেছে। এর মধ্যে বিপুলসংখ্যক স্কুলের পাঠ্যবইও রয়েছে।
কিয়েভের উপকণ্ঠে একটি ছাপাখানায় রাতের হামলায় প্রতিষ্ঠানটির ভবন ও যন্ত্রপাতি ধ্বংস হয়ে যায়। হামলার সময় সেখানে নতুন শিক্ষাবর্ষের জন্য বই ছাপার প্রস্তুতি চলছিল। প্রায় ১৩ লাখ বই উৎপাদনের পরিকল্পনা ছিল, যা ইউক্রেনে স্কুলের জন্য প্রয়োজনীয় মোট বইয়ের প্রায় ১০ শতাংশ।
হামলার পর ছাপাখানার ধ্বংসস্তূপে আগুনে পুড়ে যাওয়া একটি ইংরেজি ভাষার পাঠ্যবইয়ের পাতা পাওয়া যায়। বইটির পাতায় যুক্তরাজ্য থেকে আসা এক শিশুর পরিচয় ও তার নানির নটিংহ্যামে বসবাসের কথা লেখা ছিল। যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞের মধ্যে পড়ে থাকা ওই পাতাটি এখন ইউক্রেনের শিক্ষা খাতের ওপর যুদ্ধের প্রভাবের একটি প্রতীক হয়ে উঠেছে।
কিয়েভের ওই ছাপাখানার ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ইউক্রেনের বিভিন্ন অঞ্চলে ছাপাখানা, প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান, বইয়ের গুদাম ও সরবরাহকেন্দ্রে হামলার খবর পাওয়া গেছে। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের হিসাবে, ৩৫টির বেশি প্রকাশনা ও মুদ্রণ স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এ বছরের শুরু থেকে ইউক্রেনে ছাপা বইয়ের প্রায় এক-তৃতীয়াংশই বিভিন্ন হামলায় ধ্বংস হয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রগুলোর দাবি।
প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান কনভির বাণিজ্যিক পরিচালক ভিক্টোরিয়া হাইদাই এসব হামলাকে পরিকল্পিত বলে মনে করেন। তার ভাষ্য, গত দুই মাসে বড় কয়েকটি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের লজিস্টিক গুদামও ধ্বংস হয়েছে, যেখানে বিপুলসংখ্যক বই সংরক্ষিত ছিল।
তার অভিযোগ, মুদ্রণ ও প্রকাশনা অবকাঠামোয় হামলার মাধ্যমে ইউক্রেনের শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক পরিচয়কে দুর্বল করার চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে এটি তার পক্ষের দাবি; রাশিয়া এমন অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।
কিয়েভের হামলার আগে চলতি মাসে ইউক্রেনের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় খারকিভে একটি বইয়ের গুদামে হামলায় প্রায় ৮০ লাখ বই ধ্বংস হওয়ার কথা জানিয়েছিল সংশ্লিষ্ট প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান। এর ফলে নতুন শিক্ষাবর্ষের আগে বই সরবরাহ ব্যবস্থায় আরও চাপ তৈরি হয়েছে।
ইউক্রেনের প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান রানোকে এ ধরনের হামলাকে শিক্ষা ও সংস্কৃতির ওপর আঘাত হিসেবে বর্ণনা করেছে।
শুধু নতুন পাঠ্যবই বা প্রকাশনা গুদাম নয়, যুদ্ধের প্রভাব পড়েছে পুরোনো বইয়ের বাজারেও।
কিয়েভের পোচাইনা এলাকার পরিচিত পুরোনো বইয়ের বাজার সাম্প্রতিক হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আগুনে বহু দোকান ও বিপুলসংখ্যক পুরোনো বই পুড়ে যায়। ধ্বংসস্তূপের মধ্যেও স্থানীয় বইপ্রেমীরা উদ্ধারযোগ্য বই খুঁজে বেড়াচ্ছেন।
একজন তরুণ বইবিষয়ক ব্লগারকে ধ্বংসস্তূপের মধ্যে ভেজা ও ক্ষতিগ্রস্ত বই হাতে উদ্ধারযোগ্য কিছু খুঁজতে দেখা যায়। তার মতে, বই শুধু কাগজের তৈরি বস্তু নয়; এগুলোর সঙ্গে একটি সমাজের স্মৃতি, জ্ঞান ও সংস্কৃতি জড়িয়ে থাকে।
যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি শুধু প্রকাশনা খাতেই সীমাবদ্ধ নেই। ইউক্রেনের জাদুঘর, গ্রন্থাগার, শিল্পকলা প্রতিষ্ঠান, চলচ্চিত্র স্টুডিও এবং অন্যান্য সাংস্কৃতিক স্থাপনাও হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ঐতিহাসিক কিয়েভ-পেচেরস্ক লাভরা কমপ্লেক্সের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাও ড্রোন হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে প্রতিবেদনগুলোতে উল্লেখ করা হয়েছে। ইউনেসকোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় থাকা এই কমপ্লেক্সটি ইউক্রেনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় স্থাপনা।
ইউক্রেনের সংস্কৃতিমন্ত্রী তেতিয়ানা বেরেজনা বলেছেন, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ওপর হামলাকে যুদ্ধের সামগ্রিক ক্ষয়ক্ষতি থেকে আলাদা করে দেখা যায় না। তার দাবি অনুযায়ী, রুশ হামলায় দেশটির ১ হাজার ৯০০টির বেশি ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা এবং ২ হাজারের বেশি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
যুদ্ধের মধ্যে বই ও সাংস্কৃতিক সম্পদ রক্ষায় ইউক্রেন এখন ডিজিটাল সংরক্ষণের ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছে। গুরুত্বপূর্ণ বই, সাহিত্যকর্ম ও শিল্পকর্মের ডিজিটাল কপি তৈরি করে ভবিষ্যতের জন্য সংরক্ষণের চেষ্টা চলছে।
একই সঙ্গে ধ্বংস হয়ে যাওয়া ছাপাখানা, গুদাম ও প্রকাশনা অবকাঠামো পুনর্গঠন এবং নতুন বই প্রকাশের জন্য আন্তর্জাতিক সহায়তার প্রয়োজনীয়তার কথাও জানিয়েছে ইউক্রেন।
ইউক্রেনের পক্ষ থেকে প্রকাশনা ও সাংস্কৃতিক স্থাপনায় হামলা পরিকল্পিত বলে অভিযোগ করা হলেও রাশিয়া তা অস্বীকার করেছে।
যুক্তরাজ্যে রুশ দূতাবাসের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সাংস্কৃতিক স্থাপনা ধ্বংসের দায় ইউক্রেন সরকারের ওপর বর্তায়। রাশিয়ার দাবি, ইউক্রেনের কিছু সাংস্কৃতিক স্থাপনা সামরিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়েছে।
তবে ২০২২ সালে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইউক্রেনের বেসামরিক অবকাঠামোতে হামলার অভিযোগ রাশিয়া নিয়মিত অস্বীকার করে আসছে।
নতুন শিক্ষাবর্ষের ঠিক আগে লাখ লাখ বই ধ্বংসের ঘটনায় তাই ইউক্রেনে শিক্ষা ও প্রকাশনা খাতের ওপর যুদ্ধের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।