পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানকে কারাগারে রাখা সম্ভব হলেও তাঁর আন্তর্জাতিক পরিচিতি, ক্রিকেটীয় উত্তরাধিকার ও রাজনৈতিক প্রভাবকে সীমাবদ্ধ করা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। ইমরানকে ঘিরে বিষয়টি পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও আলোচনায় এসেছে। বিশেষ করে ক্রিকেট বিশ্বের পরিচিত ব্যক্তিত্বদের উদ্বেগ ও হস্তক্ষেপ এ ইস্যুকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। সাউথ এশিয়া মনিটরে ৩১ আগস্ট প্রকাশিত […]
ছবি: সংগৃহীত
পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানকে কারাগারে রাখা সম্ভব হলেও তাঁর আন্তর্জাতিক পরিচিতি, ক্রিকেটীয় উত্তরাধিকার ও রাজনৈতিক প্রভাবকে সীমাবদ্ধ করা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। ইমরানকে ঘিরে বিষয়টি পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও আলোচনায় এসেছে। বিশেষ করে ক্রিকেট বিশ্বের পরিচিত ব্যক্তিত্বদের উদ্বেগ ও হস্তক্ষেপ এ ইস্যুকে নতুন মাত্রা দিয়েছে।
সাউথ এশিয়া মনিটরে ৩১ আগস্ট প্রকাশিত ‘ইমরান খান, দ্য ক্রিকেটিং ওয়ার্ল্ড অ্যান্ড দ্য প্যারাডক্স কনফ্রন্টিং পাকিস্তান’ শীর্ষক এক বিশ্লেষণধর্মী নিবন্ধে এসব বিষয় তুলে ধরেছেন ভারতীয় সাংবাদিক, সম্পাদক ও আঞ্চলিক-বৈশ্বিক বিষয় বিশ্লেষক রাজু কোর্তি।
ইংল্যান্ডের সাবেক অধিনায়ক মাইকেল আথারটন সম্প্রতি লর্ডসে ইমরান খানের দুই ছেলে সুলেইমান ও কাসিমের সঙ্গে ১৮ মিনিটের একটি সাক্ষাৎকার নেন। সেখানে তারা দাবি করেন, ইমরানকে অত্যন্ত বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রাখা হয়েছে এবং তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হচ্ছে।
সাক্ষাৎকারে তাঁকে হত্যার চেষ্টা করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করা হয়। তবে এ বক্তব্যটি পরিবারের অভিযোগ হিসেবেই উল্লেখ করা হয়েছে।
এ নিয়ে পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড (পিসিবি) তীব্র প্রতিক্রিয়া জানায়। সাক্ষাৎকারটির বিষয়ে স্কাই স্পোর্টসের কাছে আনুষ্ঠানিক অভিযোগও করে তারা।
ইমরান খান পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পাশাপাশি দেশটির ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব। তাঁর নেতৃত্বেই ১৯৯২ সালে পাকিস্তান প্রথম এবং এখন পর্যন্ত একমাত্র ক্রিকেট বিশ্বকাপ জেতে।
এই ক্রিকেটীয় উত্তরাধিকারই ইমরানের প্রতি আন্তর্জাতিক ক্রিকেট অঙ্গনের একটি বিশেষ আবেগ তৈরি করেছে। ফলে মাইকেল আথারটনের মতো একজন সাবেক ইংল্যান্ড অধিনায়ক যখন তাঁর স্বাস্থ্য ও কারাবন্দি অবস্থার মানবিক দিক নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন, তখন বিষয়টি শুধু পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিতর্ক হিসেবে দেখার সুযোগ কমে যায়।
ইমরানের যথাযথ চিকিৎসা এবং মানবিক আচরণ নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়ে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফের কাছে আবেদন জানিয়েছেন ২২ জন সাবেক আন্তর্জাতিক ক্রিকেট অধিনায়ক।
তালিকায় ভারতের সুনীল গাভাস্কার, কপিল দেব ও দিলীপ ভেংসরকার এবং অস্ট্রেলিয়ার গ্রেগ চ্যাপেল ও ইয়ান চ্যাপেলের মতো পরিচিত ক্রিকেটারদের নাম রয়েছে।
ফলে ইমরান খানকে ঘিরে বিরোধ এখন শুধু পাকিস্তানের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের সাবেক অধিনায়করাও তাঁর চিকিৎসা ও কারাবন্দি অবস্থার বিষয়ে প্রকাশ্যে উদ্বেগ জানাচ্ছেন।
অস্ট্রেলিয়ার সাবেক অধিনায়ক গ্রেগ চ্যাপেল ইমরানের শারীরিক অবস্থার অবনতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, কয়েক বছর আগে পাকিস্তানে দেখা ইমরানের তুলনায় বর্তমানে তাঁকে অনেক দুর্বল মনে হচ্ছে।
ইমরানের সাবেক সতীর্থ ও পাকিস্তানের কিংবদন্তি ক্রিকেটার জাভেদ মিয়াঁদাদও এ ঘটনায় আবেগপূর্ণ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেটার উসমান খাজা পিসিবির প্রতিক্রিয়া নিয়ে ব্যঙ্গাত্মক মন্তব্য করেছেন।
তাদের কেউই রাজনৈতিক কর্মী নন। তারা ইমরানের সাবেক সতীর্থ কিংবা আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের পরিচিত ব্যক্তিত্ব। ফলে তাঁদের উদ্বেগ ইমরান ইস্যুকে আলাদা ধরনের নৈতিক ও মানবিক গুরুত্ব দিচ্ছে।
বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ইমরান খানের কারাবাসকে শুধু শেহবাজ শরিফ সরকার কিংবা কারা কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখলে পাকিস্তানের ক্ষমতার কাঠামো পুরোপুরি বোঝা যাবে না।
ইমরানের রাজনৈতিক আন্দোলন এবং পাকিস্তানের সামরিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যকার দীর্ঘদিনের ক্ষমতার দ্বন্দ্বের সঙ্গেও তাঁর কারাবাস ও রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ গভীরভাবে যুক্ত। বিশ্লেষকের মতে, সামরিক প্রতিষ্ঠান ইমরানকে কেবল একজন রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে নয়, বরং দীর্ঘদিনের ক্ষমতাকাঠামোর জন্য সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ হিসেবেও দেখে।
আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের পরিচিত ব্যক্তিত্বদের বক্তব্য পাকিস্তানের ওপর নৈতিক ও আন্তর্জাতিক চাপ বাড়াতে পারে। তবে এই চাপ সরাসরি দেশটির রাজনৈতিক, নিরাপত্তা বা সামরিক কাঠামোর সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।
তারপরও এ ধরনের আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়ার গুরুত্ব রয়েছে। এতে ইমরানের কারাবাস ও স্বাস্থ্য পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক আলোচনায় থাকে, তাঁর চিকিৎসা নিয়ে একটি আন্তর্জাতিক রেকর্ড তৈরি হয় এবং পাকিস্তান সরকারের ওপর নজরদারি বাড়ে।
বিশেষ করে তাঁর শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি হলে বিষয়টি সরকারের জন্য বড় রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক চাপ তৈরি করতে পারে।
ইমরান খানের স্বাস্থ্য নিয়ে ওঠা সব অভিযোগকে সত্য হিসেবে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। তবে সমস্যাটি হচ্ছে, তাঁর বর্তমান শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য তথ্যের ঘাটতি রয়েছে।
ইমরানের বয়স ৭৩ বছর। তিনি দীর্ঘদিন ধরে কারাগারে রয়েছেন এবং তাঁর পরিবার চিকিৎসা নিয়ে বিভিন্ন অভিযোগ করেছে। এই পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্যের স্বচ্ছতা না থাকলে গুজব ও নানা ধরনের জল্পনা আরও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ তৈরি হয়।
এ ক্ষেত্রে স্বাধীন চিকিৎসা পরীক্ষা, নিয়মিত স্বাস্থ্য প্রতিবেদন প্রকাশ, পরিবার ও আইনজীবীদের পর্যাপ্ত প্রবেশাধিকার এবং তাঁর প্রকৃত স্বাস্থ্য পরিস্থিতি সম্পর্কে স্বচ্ছ তথ্য প্রকাশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
ইমরান খানকে দীর্ঘদিন কারাগারে রেখে রাজনৈতিকভাবে নিষ্ক্রিয় করার চেষ্টা করা হলেও সেটিই শেষ পর্যন্ত সমস্যার সমাধান হবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
একদিকে, দীর্ঘদিন কারাবন্দি রেখে তাঁকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে রাখা সম্ভব হতে পারে। অন্যদিকে, তাঁর স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ বাড়লে কিংবা তাঁর সঙ্গে অন্যায় আচরণ করা হচ্ছে—এমন ধারণা শক্তিশালী হলে তিনি আরও বড় রাজনৈতিক প্রতীকে পরিণত হতে পারেন।
এটাই পাকিস্তানের ক্ষমতাকাঠামোর সামনে বড় একটি ‘প্যারাডক্স’ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে সামরিক প্রতিষ্ঠান, নির্বাচিত সরকার, জনপ্রিয় রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও জনমতের সম্পর্ক পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। ইমরান খানের ক্ষেত্রে ক্রিকেটীয় পরিচয়ও তাঁর রাজনৈতিক জনপ্রিয়তার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। ফলে তাঁর ক্রিকেটীয় উত্তরাধিকার এখনও পাকিস্তানের সীমানার বাইরে তাঁর রাজনৈতিক পরিচিতিকে শক্তিশালী করছে।
একজন জনপ্রিয় নেতাকে দীর্ঘদিন রাজনৈতিক পরিসর থেকে সরিয়ে রাখলেই তাঁর জনপ্রিয়তা শেষ হয়ে যাবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। বরং কখনো কখনো কারাবাসই একজন নেতাকে আরও শক্তিশালী রাজনৈতিক প্রতীকে পরিণত করতে পারে।
ইমরান খানকে কারাগারে রাখা সম্ভব হলেও তাঁর ক্রিকেটীয় উত্তরাধিকার ও আন্তর্জাতিক পরিচিতিকে আটকে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। ১৯৯২ সালের বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক হিসেবে বিশ্ব ক্রিকেটে তাঁর যে অবস্থান তৈরি হয়েছে, সেটিই এখন তাঁর কারাবাস ও স্বাস্থ্য পরিস্থিতির আলোচনাকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছে।
ফলে পাকিস্তানের জন্য প্রশ্নটি শুধু ইমরান খানকে কীভাবে রাজনৈতিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে, তা নয়। তাঁকে নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টাই তাঁকে আরও বড় রাজনৈতিক প্রতীকে পরিণত করছে কি না—সেটিও এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সূত্র: সাউথ এশিয়া মনিটর